Bangla FM
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • বিশ্ব
  • সারাদেশ
  • বিনোদন
  • খেলাধুলা
  • কলাম
  • ভিডিও
  • অর্থনীতি
  • ক্যাম্পাস
  • আইন ও আদালত
  • প্রবাস
  • বিজ্ঞান প্রযুক্তি
  • মতামত
  • লাইফস্টাইল
No Result
View All Result
Bangla FM

সামগ্রিক মুক্তির প্রশ্ন ও অবিসংবাদিত কিংবদন্তি বিপ্লবী নেতা হো চি মিন

Bangla FM OnlinebyBangla FM Online
১২:১৯ pm ১৯, মে ২০২৬
in Semi Lead News, কলাম
A A
0

সৈয়দ আমিরুজ্জামান:

“আমাদের পাহাড়গুলি চিরকাল থাকবে
আমাদের নদীগুলি চিরকাল থাকবে
আমাদের জনগণ চিরকাল থাকবে
মার্কিন হানাদার পরাজিত হবে
আবার‌ আমরা আমাদের দেশকে গড়ে তুলবো
দশগুণ সুন্দর করে।”
-(হো চি মিনের শেষ‌ ইচ্ছাপত্র, ১৯৬৯)

সারাবিশ্বের মেহনতি মানুষ এবং নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ধ্রুব নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল ভিয়েতনাম বিপ্লবের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি বিপ্লবী মহানায়ক কমরেড হো চি মিনের ১৩৬তম জন্মবার্ষিকী আজ।

কমিউনিস্ট বিপ্লবী এই নেতা পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক ভিয়েতনাম প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার পেছনেও কমরেড হো-র উদ্যোগী ভূমিকা ছিল। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

বিগত শতাব্দীর বা বর্তমান সময় পর্যন্ত শ্রেষ্ঠতম আন্তর্জাতিক মহান কমিউনিস্ট নেতাদের মধ্যে বিপ্লবী হো চি মিন ছিলেন অন্যতম। যার জীবনে অসম্ভব বলে কোনো শব্দ ছিল না, অনায়াসে বলতে পারতেন দৃঢ় সঙ্কল্প নিয়ে একজন কমিউনিস্ট পাহাড় ভেঙ্গে ফেলতে পারে।

মহান সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত বিপ্লবের মহানায়ক কমরেড ভ ই লেনিনের লিখিত ‘COLONIAL THESIS’ প্রকাশিত হয়েছিল ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘Lumani’তে। এই থিসিসে অনেক রাজনৈতিক বাক্য ছিল যা হো চি মিন প্রাথমিক পর্যায়ে উপলব্ধি করতে পারেন নি। বারবার পড়ার পর এই থিসিস্ তাঁকে অনুপ্রেরণা দেয়। বুঝতে পারেন ভিয়েতনামের মুক্তি আন্দোলনের এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পথ। তিনি এতটাই আপ্লুত হয়েছিলেন লাইব্রেরির কক্ষে বসে Colonial Thesis পড়তে পড়তে আনন্দাশ্রুতে ভিজিয়ে ফেলতেন সেই বইকে। ১৯২৪ সালের ২১শে জানুয়ারী মহামতি লেনিনের মৃত্যুর খবর হো চি মিনের কাছে যখন পৌঁছায় প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি বিহ্বল হয়ে পড়েন। বিশ্বাস করতে পারেন নি এমন একটি কঠিন সংবাদ। কিন্তু সমগ্ৰ সোভিয়েত ইউনিয়নে অর্ধনমিত লাল পতাকা যেন সোচ্চারে আঘাত করে হো চি মিনের হৃদয়কে। হো চি মিন নিজের মুখেই বলেছিলেন, “লেনিন যখন জীবিত ছিলেন তখন তার সাথে দেখা করার সুযোগ হয়নি। সেটা আমাকে সারাজীবন দু:খ দেবে”।
কমরেড হো চি মিন ছিলেন ব্যতিক্রমী কমিউনিস্ট। তত্ত্বকে সহজেই জনগণের কাছে নিয়ে যেতে পারতেন, ভাষা বুঝতেন জনগণের। কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে জনগণের ভালোবাসা পেতে গেলে তুমি বয়স্কদের শ্রদ্ধা করবে, মহিলাদের সম্মান দেখাবে এবং শিশুদের সঙ্গে পিতার মতো ব্যবহার করবে। সবচেয়ে বড় কথা তিনি বলতেন স্থানীয় রীতিনীতিকে তোমাকে সবসময় সম্মান জানাতে হবে, সেই রীতিনীতি যতই অদ্ভুত ঠেকুক না কেন!
কর্মীদের তিনি তিনভাগে ভাগ করেছিলেন:
১) একদল যে কোনো সংগ্ৰামে বিশ্বস্ত থাকে।
২) আর একদল ঝাঁপায় কিন্তু পুলিশ দেখলেই শামুকের খোলে গুটিয়ে যায়।
৩) আর একদল স্বেচ্ছা বিপ্লবী শেষপর্যন্ত সবাইকে রক্ষা করতে পারে না।
আসল কথা যত বেশী সম্ভব মানুষকে বোঝাতে হবে বিপ্লব অনিবার্য।
হো চি মিন বলতেন,
১) কঠিন শব্দ পরিহার করো
২) জনগণের ভাষায় কথা বলতে শেখ
৩) গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন বোঝানোর আগে তাদের পরিবার সম্পর্কে সচেতন থাকো, তাহলেই দেখবে তোমাদের কথা তারা মন দিয়ে শুনছে।
তিনি মনে করতেন যতই মেধাসম্পন্ন তুমি হও না কেন, এই গুণ রপ্ত করা ব্যতিরেকে একজন কর্মী হয়ে উঠতে পারবে না।
হো চি মিন বিশ্বাস করতেন, “আটাত্তর বছর আর কি এমন বয়স, সে তো শক্ত হাতে দেশের দায়িত্ব নিতে পারে”।
হো চি মিনের লেখা কবিতা আশাবাদের কবিতা।
জীবনের জন্য, ভালোবাসার জন্য গান বা কবিতা লিখতে হলেও বুকে কিছু দম লাগে।
তাই তিনি লিখেছিলেন,
“গম পিষছে এক পাড়াগেঁয়ে মেয়ে
সামনে তার জ্বলছে
গনগনে এক উনুন
মানুষের মন পরাজয় জানে না”।
ভিয়েতনামের স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা নেতৃত্ব কমরেড হো চি মিন। বিশ্ব ইতিহাসে যে কয়জন নেতৃত্ব সামগ্রিক মুক্তির জন্য সমগ্র জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করে স্বাধীনতার দূত হয়ে উঠেছিলেন কমরেড হো চি মিন তাদের মধ্যে অন্যতম। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে অসাধারণ ও একটি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে উঠতে পারেন তারই বড় প্রমাণ হো চি মিন। এই আধুনিক বিশ্বেও তার কীর্তি পরিবর্তন অভিমুখী মুক্তিকামী মানুষের জন্য প্রাতঃস্মরণীয় ও অনুপ্রেরণীয়।

কমরেড হো চি মিন ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠাতা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমৃত্যু ভিয়েত কং-এর নেতৃত্ব করেন তিনি। স্বপ্ন দেখেছেন নতুন ভিয়েতনামের এক স্বাধীন রাষ্ট্রের। স্বপ্ন দেখেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই করেছেন ফরাসি ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। জনগণের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতা সাধারণ জনগণের জন্য। পড়াশোনা শেষ করেই জড়িয়ে পড়েন ফরাসি বিপ্লবে। তার সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন তার বাবা নগুয়েন সাক। পরিণতি হিসেবে শাসকগোষ্ঠী অন্যান্য আন্দোলনকারীর সঙ্গে তাকেও গ্রেফতার করে। পরে ফরাসি শাসকগোষ্ঠী সিন সাককে আটকে রাখে পৌলো বন্দর কারাদ্ব্বীপে। বাবা গ্রেফতার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল হো চি মিনের ছাত্রজীবন এবং শুরু হলো প্রত্যক্ষ সংগ্রামী জীবন। এ সময় তিনি হুয়েং শহর ত্যাগ করে ফ্যান থিয়েট শহরে চলে যান। সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। সময়টা ছিল ১৯০৭ থেকে ১৯১১ পর্যন্ত। ইতিহাসবিদরা এটি তার আন্দোলনের পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এদিকে হো চি মিনের বাবাকে পৌলো বন্দর কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হলো। এ সময় বাবার সঙ্গে পুত্রের দেখা হয়। হো চি মিনের বাবা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলেন তার এ তরুণ সন্তানের মনে ব্যাপক ক্ষোভ আর যন্ত্রণা। তিনি অন্তরদৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করলেন এ সন্তান তার একার নয়। এ সন্তান এখন সারা ভিয়েতনামের সংগ্রামী মানুষের। তিনি হো চি মিনকে প্যারিস পাঠানোর চিন্তা করলেন। কিন্তু এ জন্য কারিগরি বিদ্যালয়ে পড়তে হবে তিন বছর। হো চি মিন তিন বছর সময় নষ্ট না করে একটি চাকরি জোগাড় করে ফেললেন। সায়গান আর ফ্রান্সের ভার্সাই বন্দরের মধ্যে যাতায়াতকারী এস এস লা তুচে ত্রিভেলি নামের এক জাহাজে চাকরি হলো তার। তিনি যাত্রা শুরু করলেন প্যারিসের পথে।

ভার্সাই সম্মেলন এবং আট দফা দাবি

প্রথম সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ থেমে গেছে। কিন্তু সারা দুনিয়ার ভাগ-বাটোয়ারা শেষ হয়নি। শেষ হয়নি বিভিন্ন জাতির ভাগ্য নির্ধারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর এ স্থানেই ১৯১৯ সালে জার্মানি ও মিত্রবাহিনীর মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ভার্সাই চুক্তি নামে পরিচিত, নটরডেম প্যারিসে অবস্থিত। সাম্রাজ্যবাদী দস্যুরা সেই কাজ শেষ করার জন্য ১৯১৯ সালের বসন্তকালে সম্মিলিত হন ভার্সাইতে। উন্নত বিশ্বের নেতাদের যখন নিজেদের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই বোমা ফাটান বিপ্লবী এই নেতা। বজ্রকণ্ঠে উত্থাপন করলেন আট দফা দাবি। ভিয়েতনামি জনগণের পক্ষ থেকে ‘জাতিসমূহের অধিকার’ শিরোনামে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কে এই প্রস্তাব উত্থাপনকারী যুবক? নগুয়েন ভ্যান কুং অর্থাৎ দেশপ্রেমিক নগুয়েন। শুরু হলো ছদ্মনাম গ্রহণের পালা। নাম হলো হো চি মিন, এর অর্থ আলোর দিশারী। ভার্সাইতে তার উপস্থাপিত মূল বিষয়গুলোর মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি, ফরাসি ও ভিয়েতনামিদের মধ্যে সমান অধিকার, জবরদস্তিমূলক শ্রম বিলোপ, লবণ কর রহিত এবং জবরদস্তিমূলক মদ্যপান ব্যবস্থার বাতিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই প্রস্তাবই হলো সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের বিরুদ্ধে তার প্রথম আঘাত। ভিয়েতনামের ওপর কর্তৃত্বকারী ফ্রান্সের বুকে বসে ফরাসি উপনিবেশবাদবিরোধী তার পিতৃ-মাতৃভূমির মুক্তির সনদ দাখিল করলেন হো চি মিন। অবাক বিস্ময়ে দেখল বিশ্ব!

দেশে দেশে বিপ্লবী ভাষণ

বিপ্লবী মহান এই নেতা ভিয়েতনামকে স্বাধীন রাষ্ট্র এবং দেশের সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য আজীবন আন্দোলন করে গেছেন। ১৯২০ সালের ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় দিনের প্যারিস সফরে যান। সেখানে ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টির ১৮৩তম অধিবেশনে যোগ দেন ভিয়েতনামের প্রতিনিধি হিসেবে। বিশ্ব প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরেন ভিয়েতনামের ওপর ফরাসিদের নিপীড়নের কথা। দেশের মানুষের ঐক্য আর সংগঠনের মাধ্যমে বিপ্লব গড়ে তুলতে গঠন করেন ভিয়েতনামি বিপ্লবী তরুণ সংঘ। অনেক সংগ্রামের পর ভিয়েতনামে শেষ হয় ফরাসি শাসন। ভিয়েতনামের আলোর দিশারি হো চি মিন তার ভাষণে বলেন, ‘প্রিয় বন্ধুগণ, বিপ্লবের জন্য আপনাদের সাহায্য করার প্রয়োজনে আজ এখানে আসতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে স্বীকার করছি যে, আমার জন্মভূমিতে যে ঘৃণ্য ও অবিচার সংঘটিত হয়েছে ও হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর উদ্দেশ্য নিয়েই কমিউনিস্ট হিসেবে আমি এখানে উপস্থিত হয়েছি। আপনারা অবগত আছেন, পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় হতে চলল ফরাসি পুঁজিবাদী শোষকগোষ্ঠী ইন্দোচীনে তার হিংস্র রূপ নিয়ে এ অঞ্চলে উপস্থিত রয়েছে। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজনে বেয়নেটের শক্তিতে তারা আমাদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেছে। শুরু থেকে আজ অবধি আমাদের ওপর শুধু যে নির্যাতন ও শোষণ চলছে তাই নয়, চলছে অবাধ হত্যাকাণ্ড ও বিষ প্রয়োগও। পুঁজিবাদী লুটেরারা ইন্দোচীনের ওপর কী পরিমাণ কুৎসিত নিপীড়ন চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে তার বিশদ বর্ণনা সামান্য কয়েক মিনিটের মধ্যে আপনাদের সামনে উপস্থিত করা সম্ভব নয়।’ এ ছাড়া ১৯২৪ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি হো চি মিন কমিন্টার্নের নির্দেশে চীনের ক্যান্টনে বলেন, ‘একজন মানুষ যা চাইবে ইন্দোচীনে তার সবই আছে। যেমন বন্দর, খনি, বিস্তীর্ণ শস্যখেত, বিরাট বনভূমি এবং যোগ্য ও কঠোর পরিশ্রমী শ্রেণি। কিন্তু আমাদের সংগঠন ও সংগঠকের বড্ড অভাব। সে কারণেই আমাদের শিল্প আর ব্যবসা বাণিজ্যের কোনো মূল্য নেই। যদি তোমার যুবসমাজ জীবনের মধ্যে ফিরে না আসে, তবে তোমার মৃত্যু অনিবার্য।’

না ফেরার দেশে

মহান এই বিপ্লবী নেতা ১৯৬৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। হো চি মিন হয়তো তার জীবনকালে নিজ দেশের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। এখন নিশ্চয়ই মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়ে হাস্যোজ্জ্বল সেই মহান নেতা যখন দেখেন তার দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে তখন তিনি নিশ্চয়ই আনন্দিত হন। কমরেড হো চি মিন আজও দুনিয়ার শোষিত-নিপীড়িত মানুষের কাছে অসামান্য প্রেরণা।

শৈশব থেকেই সংগ্রামী

নগুয়েন ভ্যান কুং, নগুয়েন তাত থান, ভুয়ং সন নিহি, লিনভ এবং হো চি মিন প্রতিটি নাম একজন মানুষেরই। প্রথম দুটি ছদ্ম নাম হলেও শেষের নামটিতে তাকে সবাই চেনেন। ছেলেবেলায় আদর করে ‘আঙ্কেল হো’ বলে ডাকা হতো। ১৮৯০ সালের ১৯ মে তার জন্ম। ফরাসি আশ্রিত রাজ্য আন্নামের নগেয়ান প্রদেশের হোয়াংট্রু গ্রামটি তার জন্মস্থান হলেও শৈশব কাটে কিম লিয়েন গ্রামে। বাবার নাম নগুয়েন হুই ওরফে নগুয়েন সিন সাক ছিলেন ক্ষেতমজুর পরিবারের সন্তান। দাসত্বের এ জীবন সিন সাকের ভালো লাগত না। তাই মুক্তির উপায় হিসেবে শিক্ষাকে বেছে নেন। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পড়াশোনা করে হয়ে ওঠেন শিক্ষক। প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে পণ্ডিত আন তার বড় মেয়ে হোয়াং আই লোয়ানের সঙ্গে তার বিয়ে দেন। হো চি মিনের মা হোয়াং আই লোয়ানও পরিশ্রমী নারী ছিলেন। বাবা-মায়ের মতো হো চি মিনের জীবন সংগ্রামও শুরু হয় শৈশব থেকেই। তার বাবার আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করেন। তার যখন বয়স ১০ তখন তারা গ্রাম ছেড়ে বাবার শিক্ষকতা পেশা শুরু করার জন্য হুয়েং শহরে চলে আসেন। সংসারে তিন ভাই-বোনের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হতো হো চি মিনের বাবার। প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হতো হো চি মিনের মায়ের। এভাবে মা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মারা যান হো চি মিনের মা। মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েন তিনি। তার বাবাও হতাশায় পড়েন। ঠিক করা হলো হো চি মিনকে আবারও গ্রামে পাঠিয়ে দেবেন। হুয়েং শহর ছেড়ে হো চি মিন আবারও চলে আসেন তার প্রিয় সবুজ ঘেরা গ্রামে।

পাড়ি জমালেন হুয়েং শহরে

১৯০৪ সালে তরুণ হো চি মিন দ্বিতীয়বারের মতো পাড়ি জমালেন হুয়েং শহরে। গ্রামে থাকার সময় তিনি উপলব্ধি করেন তাকে আরও জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তাই পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি তিনি নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, মানুষ এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে যান। তার একটাই উপলব্ধি ছিল, ‘শিখতে হবে মানুষের কাছ থেকে, জানতে হবে পৃথিবীকে।’ ১৯০৭ সালে হো চি মিন বিদ্যালয়ের পড়াশোনা বেশ কৃতিত্বের সঙ্গেই শেষ করেন। তার পড়াশোনা শেষ হতেই ভিয়েতনামজুড়ে চলতে থাকে খণ্ড খণ্ড ফরাসিবিরোধী বিক্ষোভ। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল দেশের মাটি থেকে বিদেশিদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা। শহরে এসেই বুঝতে পারলেন নিজেদের মাতৃভূমিতে তাদের কোনো অধিকার নেই। তাদের দেশ শাসন করছে ফরাসিরা। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন ফরাসি নাগরিক। অন্য শিক্ষকরা ভিয়েতনামি হলেও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কারও কিছু বলার সাহস ছিল না। স্কুলেই এমন পরাধীনতা তাকে আরও বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত করে। সে সময় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু আন্দোলন হলেও সুসংগঠিত কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। ঠিক এ সময়ে হুয়েং শহরে গড়ে ওঠে এক গোপন বিপ্লবী সংগঠন। হো চি মিন এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে প্রচারপত্র বিলি করতেন এবং বোঝাতেন, অত্যাচারী ফরাসিদের দেশ থেকে বিতাড়িত না করলে দেশে শান্তি আসবে না। বিদেশি শাসন-শোষণ আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষ এ আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শে

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ফ্রান্সে বসবাস শুরু করেন, ঠিক তখনই তিনি ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শে। কীভাবে তিনি লেনিনবাদের প্রতি আকৃষ্ট হলেন, তা নিজেই লিখেছেন- ‘গোড়ার দিকে, সাম্রাজ্যবাদ নয়, দেশপ্রেমই আমাকে লেনিন ও তৃতীয় আন্তর্জাতিকের প্রতি বিশ্বাসী করে তুলেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সংগ্রামে, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ অধ্যয়ন আর তার পাশাপাশি বাস্তব কার্যকলাপে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমি এই সত্যকে উপলব্ধি করতে পারি যে, কেবল সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদই সমস্ত বিশ্বের নিপীড়িত জাতি এবং শ্রমজীবী জনগণকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিতে পারে।’

বিশ্ব ভ্রমণে

কমরেড হো চি মিন সুদীর্ঘকাল এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ আর আমেরিকার দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন জাহাজের রসুইখানায় বাবুর্চির সহকারী হিসেবে। প্যারিসে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন তা হলো নগরকেন্দ্রিক জীবনের পঙ্কিলতা। শিক্ষা সভ্যতার ছদ্মাবরণে বীভৎস ক্রিয়াকাণ্ডের ঘটনা দ্রুত তার কাছে স্পষ্ট হয়। তার মনে হয় নগরীর ভদ্রজনেরা জরাগ্রস্ত পঙ্গু। সবাই মানসিক ব্যাধির ভুগন্ত রোগী। হো চি মিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে জাহাজের সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে মিশতেন। আর নতুন করে পরিচিত হতেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে।

সামগ্রিক মুক্তির অগ্নিদূত, সারাবিশ্বের মেহনতি মানুষ এবং নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ধ্রুব নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল ভিয়েতনাম বিপ্লবের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি বিপ্লবী মহানায়ক কমরেড হো চি মিন স্মরণে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

“হো চি মিন”

রক্তাক্ত শতাব্দীর গাঢ় অন্ধকার ভেদি, জেগেছিল এক নাম—অগ্নিময় দীপ্তি খেদি, ক্ষুধার্ত মানুষেরা উচ্চারিত কণ্ঠ ভরে, শুনেছিল মুক্তির ডাক ধ্বনিত বিশ্বজুড়ে। ভিয়েতনামের মাঠে, ধানের গন্ধমাখা ভোরে, উঠেছিল যে বজ্রধ্বনি শ্রমিক-কৃষক ঘোরে, সেই ধ্বনির মূলে ছিল দুর্জয় এক মহান, হো চি মিন—ইতিহাসে দীপ্তিমান অবিরাম।

শৃঙ্খলিত উপনিবেশ, জ্বলন্ত গ্রাম-নদী, দুঃখে ডুবে ছিল তখন সমগ্র ইন্দোচীনভূমি; ফরাসি শাসকেরা লুণ্ঠিত করত প্রাণ, মাটির সন্তান হতো আপন ঘরেই পরান। শস্যখেতে রক্ত ঝরত, বন্দরে কান্নার ঢেউ, নদীর বুকে জেগে উঠত বিষণ্ন বিষাদ ঢেউ; তবু অন্ধকার ভেদি মানুষ রাখত মান, একদিন আসবেই মুক্তি—ছিল অবিচল জ্ঞান।

সেই সময় নগেয়ানের নিভৃত সবুজ গ্রামে, জন্ম নিল এক শিশু কৃষকের ক্ষুদ্র ঘরে; মায়ের চোখে স্বপ্ন ছিল, পিতার বুকে জেদ, দাসত্বের পৃথিবীটাকে করবে একদিন ভেদ। নগুয়েন ভ্যান কুং তখন নামের কোমল ছায়া, শৈশব জুড়ে দারিদ্র্য আর বিষণ্নতার মায়া; তবু কিশোর হৃদয়জুড়ে আগুনেরই বাস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেন জন্মগত প্রতিবাদ।

ক্ষেতের মাটির গন্ধ মেখে বেড়ে ওঠা সেই, দেখেছে মা ক্লান্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে ঢলে; দেখেছে পিতার চোখে পরাজয়ের ক্ষত, দেখেছে বিদেশি শাসন কী নির্মম অভিশাপ। হুয়েং শহরের পাঠশালায় কিশোর মনে ক্ষোভ, নিজের দেশে পরের শাসন—কী অসম্ভব রোষ! শিক্ষকেরও মুখে তখন বিদেশি প্রভুর ছাপ, শিশুমনে জমে উঠত বিদ্রোহী অভিশাপ।

প্রচারপত্র হাতে নিয়ে পথে পথে তরুণ, স্বদেশমুক্তির আহ্বানে অগ্নিময় তখন; বলত, “মাটি রক্ষার দায় জনগণেরই হাতে, বিদেশিকে উৎখাত করো, জাগো একসাথে।” গোপন সভা, গোপন শপথ, রাত্রির অন্ধকার, তরুণ হৃদয় শিখে নিল সংগ্রামের উচ্চারণ; শৈশব পেরোনোর আগেই বুঝল এই প্রাণ, স্বাধীনতা ভিক্ষা নয়—অর্জনেরই দান।

জাহাজভরা দূর সমুদ্র ডেকে নিল পরে, সায়গন বন্দর ছাড়ল সে অজানা অভিযানে; রসুইঘরের শ্রমিক হয়ে ঘুরল দেশদেশান্তর, দেখল সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতার অন্তর। প্যারিস নগর ঝলমলে, আলোয় ঢাকা ক্ষয়, ভদ্রতার মুখোশপরা লোভের নির্মম জয়; কারখানাতে শ্রমিক কাঁদে, বন্দরে কালো ধোঁয়া, সভ্যতার অন্তরালে জমে মৃত্যুর ছোঁয়া।

আফ্রিকার উপকূলে, আমেরিকার পথে, দেখল কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের রক্ত ঝরে কত; দেখল ক্ষুধার সন্তানরা কাজের বিনিময়ে, অপমান আর বঞ্চনা পায় প্রতিদিন বয়ে। সেইসব দৃশ্য জ্বালিয়ে দিল অন্তরের প্রদীপ, বুঝল, মানুষের শত্রু শুধু ভিয়েতনামে সীমিত নয়; সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বজুড়ে রক্তচোষা জাল, মুক্তির জন্য বিশ্বজোড়া চাই নতুন কাল।

এরপর একদিন হাতে এল লেনিনের বাণী, উপনিবেশ প্রশ্নে লেখা জাগ্রত অমৃতধ্বনি; বারবার পড়তে গিয়ে কেঁদে উঠল মন, কলোনিয়াল থিসিস যেন মুক্তির আহ্বান। লাইব্রেরির নিভৃত কোণে অশ্রুসিক্ত চোখ, মনে হলো—এই তো তবে মুক্তির সঠিক লোক; লেনিন যেন দূর রাশিয়া হতে ডাকেন তাঁকে, “শোষিত জাতি জাগো এবার, দাঁড়াও নিজস্ব পাকে।”

সেদিন থেকে দেশপ্রেম আর সমাজতান্ত্রিক জ্ঞান, এক নদীতে মিলল এসে অবিচ্ছেদ্য প্রাণ; হো চি মিন বুঝে নিলেন সংগ্রামেরই পথ, শ্রমিক-কৃষক ঐক্য ছাড়া নেই মুক্তির রথ। কমিউনের লাল পতাকা উঠল বুকের মাঝে, বিপ্লব শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তবতার সাজে; মানুষকে সংগঠিত কর, ভাষা দাও সহজ, কঠিন তত্ত্ব জনতারই ভাষায় হোক প্রকাশ।

ভার্সাইয়ের সেই সম্মেলন বিশ্বশক্তির মেলা, সাম্রাজ্যবাদ ভাগ করিতে ব্যস্ত সব বেলা; সেই সভাতে দাঁড়িয়ে এক উপনিবেশ সন্তান, উচ্চারণ করল দৃপ্ত আট দফার গান। রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি চাই অবিলম্বে, শ্রমের উপর জবরদস্তি বন্ধ হোক এ ক্ষণে; সমান অধিকার চাই, চাই আত্মনিয়ন্ত্রণ, লবণ করের শৃঙ্খল ভাঙুক সর্বক্ষণ।

বিশ্ব তখন অবাক চেয়ে শুনল সেই নাম, নগুয়েন তাত থান বদলে হলো হো চি মিন মহান; অর্থ তার আলোর দিশা, মুক্তিরই প্রদীপ, শোষিত মানুষের কণ্ঠে উঠল নতুন সঙ্গীত। ফরাসিদের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল ভয়, একজন তরুণ বিপ্লবী ইতিহাসে ক্ষয়; কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জ্বলে উঠল আগুন, ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ পেল নতুন গুণ।

প্যারিস হতে ক্যান্টন নগর, মস্কো কিংবা চীন, দেশে দেশে উচ্চারিত হলো সেই সুরধ্বনি; “যুবসমাজ ফিরে এসো মানুষেরই পাশে, নইলে তোমার জাতি ডুবে মরবে পরাভবে।” তিনি জানতেন সংগঠনই বিপ্লবের প্রাণ, সাহস শুধু যথেষ্ট নয়, চাই সুদৃঢ় জ্ঞান; শ্রমিক-কৃষক-যুবকদের এক কাতারে ডেকে, গড়ে তুললেন সংগ্রামী এক ঐতিহাসিক রেখা।

কর্মীদের তিনি বলতেন, “মানুষের ভাষা শিখ, বৃদ্ধদের সম্মান দাও, শিশুকে ভালোবেসে দিক; নারীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখো, লোকাচার মানো, জনগণের হৃদয় জয় না করলে হার মানো।” কঠিন শব্দ এড়িয়ে গিয়ে সহজ করে বল, রাজনীতির আগে জেনো মানুষেরই দল; তাদের ঘরের দুঃখ জানো, জানো চোখের জল, তবেই তোমার কথাগুলো পৌঁছবে অন্তরতল।

কী আশ্চর্য নেতা ছিলেন! মাটির মানুষের ঢং, সরলতায় বিপ্লব যেন পেয়েছিল নতুন রং; চটকদার ভাষণ নয়, মানুষের হৃদয়, ভালোবাসা দিয়েই তিনি সংগঠনের জয়। তিনি বলতেন, “সংগ্রামে কেউ বিশ্বস্ত থাকে, কেউ বা ভয়ে সরে যায় পুলিশ দেখামাত্র; তবু যত বেশি সম্ভব মানুষকে বোঝাও, বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী—এই বিশ্বাস ছড়াও।”

ফরাসি শাসন কেঁপে উঠল দীর্ঘ সংগ্রামে, গ্রামেগঞ্জে গেরিলা যুদ্ধ জ্বলল অবিরামে; ধানক্ষেতে কৃষক তখন হাতে তুলে বন্দুক, মুক্তির গান উঠল জেগে ঝড়ের মতো মুখ। কারাগারের অন্ধকূপে অত্যাচারের রাত, তবু ভাঙেনি সংগ্রামীদের ইস্পাতসম হাত; কারণ তাদের সম্মুখপানে দাঁড়িয়ে আছেন যিনি, তিনি হো চি মিন—জনতারই অমর আলোকবীণা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এলে বদলালো সময়, জাপানি আগ্রাসনের কালো অন্ধকারময়; তবু সেই সংকটকালেও সংগঠনের ডাক, ভিয়েত মিনের পতাকা হলো মুক্তিযুদ্ধের পাক। পাহাড়জঙ্গলে, নদীপথে, গোপন আস্তানায়, মুক্তিসেনা প্রস্তুত হয় প্রতিরোধের ছায়ায়; ক্ষুধার্ত জনতার হাতে স্বপ্নের লাল মানচিত্র, স্বাধীন দেশের প্রত্যয়ে অটুট দৃঢ় চিত্র।

উনিশশো পঁয়তাল্লিশে স্বাধীনতার বাণী, হ্যানয়ের আকাশ ভেদি উঠল মহান ধ্বনি; “সব মানুষ সমান হবে”—ঘোষণা দিল দেশ, শতবর্ষের দাসত্ব হতে মুক্তির পরিবেশ। ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক জন্ম নিল শেষে, মানুষ দেখল ইতিহাসের নতুন প্রভাত এসে; কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ তখন ছাড়েনি তার দখল, ফরাসিরা ফিরল আবার যুদ্ধের নতুন বল।

ডিয়েন বিয়েন ফুর প্রান্তরে বজ্রনিনাদ শোন, কৃষকের ছেলে রাইফেল হাতে ইতিহাস রচন; ফরাসি শক্তি ভেঙে গেল জনগণের জোরে, সাম্রাজ্যবাদ বুঝল শেষে হার মানিতে হবে। কিন্তু আবার আমেরিকা নামল যুদ্ধক্ষেত্রে, নাপাম আগুন বর্ষিত হলো শিশুদেরই বুকে; গ্রাম পোড়ানো, বিষাক্ত গ্যাস, রক্তস্রোতের ঢল, তবু মাথা নোয়ায়নি ভিয়েতনামের জনবল।

হো চি মিনের কণ্ঠ তখন বজ্রেরই সমান, “আমাদের পাহাড় থাকবে, থাকবে নদীর প্রাণ; থাকবে আমাদের মানুষ, হারবে দখলদার, আমরা আবার গড়ব দেশ দশগুণ সুন্দর।” কী দুর্দান্ত আশাবাদী সেই শেষ ইচ্ছাপত্র, মৃত্যুর মুখেও দেখেছেন আগামী দিনের ভোর; মানুষের মন পরাজয় জানে না কোনোদিন, এই বিশ্বাসেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মহান হো চি মিন।

তিনি কবিতা লিখেছেন কারাগারের রাতে, অন্ধকারেও দেখেছেন সূর্যেরই প্রভাতে; গম পেষা পল্লীবালার উনুনের আগুন, তাঁর চোখে হয়ে উঠেছে মানুষেরই ধ্বনি। কবিতা তাঁর সংগ্রামেরই সহযোদ্ধা ছিল, মানবমুক্তির স্বপ্নগাঁথা শব্দে জেগে মিল; যে কবি বিপ্লব বোঝে, সে বোঝে মানুষের ক্ষুধা, তাই তাঁর প্রতিটি পঙ্‌ক্তি জাগায় মুক্তির সূচনা।

লেনিনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর, মৃত্যুসংবাদ শুনে যেন কেঁপে উঠল ধীর; বলেছিলেন, “সাক্ষাৎ যদি পেতাম জীবনে, সেটাই হতো শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য আমার জীবনে।” সোভিয়েতের অর্ধনমিত লাল পতাকার ঢেউ, আঘাত করেছিল এসে তাঁর অন্তরের ঢেউ; আন্তর্জাতিক সংহতির যে শিক্ষা নিয়েছিলেন, তারই আলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন।

তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রমিকজনের বন্ধু, আফ্রিকা হতে লাতিন দেশে ছড়িয়েছেন সেই বীজ; শোষিত মানুষের সংগ্রাম একই সূত্রে বাঁধা, এক দেশের মুক্তি অন্য দেশেরও সাধনা। তাই তো কিউবা, প্যালেস্টাইন, এশিয়ার বহু দেশ, হো চি মিনের সংগ্রাম দেখে খুঁজে পেয়েছে রেশ; স্বাধীনতার লড়াই শুধু মানচিত্রের নয়, মানুষের মর্যাদারও অপরিহার্য জয়।

বাংলার মাটিতেও আজ প্রতিধ্বনি তোলে, শ্রমিক-কৃষক-জনতার অধিকারী কলে; অসমতা আর সাম্প্রদায়িক বিষের বিরুদ্ধে দাঁড়াও, মুক্তির প্রশ্নে জনগণের ঐক্য গড়ে তোলাও। হো চি মিনের শিক্ষা আজও অমলিন দীপশিখা, ন্যায় ও সমতার পথে জাগায় নতুন দীক্ষা; শোষণের যে রূপই হোক, রুখে দাঁড়াও সবাই, মানুষের মুক্তি ছাড়া ইতিহাসে শান্তি নাই।

আজও যখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা, লাভের নেশায় মানুষ পোড়ায় অমানবিক ঘরবাড়ি; আজও যখন শিশু মরে ক্ষুধা ও বোমাঘাতে, হো চি মিনের কণ্ঠ যেন ধ্বনিত হয় রাতে; “মানুষকে ভালোবাসো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সংগঠিত হও সবাই মুক্তিরই প্রতিশ্রুতে।” তাঁর জীবন এক বিদ্যালয় সংগ্রামী পৃথিবীর, অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে অনমনীয় স্থির।

তিনি দেখিয়েছেন সাধারণ মানুষও পারে, ইতিহাসের গতিপথ বদলাতে এক ধারে; একটি জাতির স্বপ্ন যদি জাগে জনমানসে, সাম্রাজ্যবাদ টিকতে পারে না কোনো উপায়ে শেষে। মাটির ঘরে জন্ম নিয়েও বিশ্বনেতার স্থান, এই তো মানুষের শক্তির শ্রেষ্ঠতম প্রমাণ; তাই তো শতবর্ষ পেরিয়েও তাঁর নাম জাগে, দুর্বার মুক্তিসংগ্রামের লাল পতাকার ফাঁকে।

হে মহান বিপ্লবী নেতা, নাও লাল অভিবাদন, শ্রমিকের রক্তে লেখা তোমারই জয়গান; ভিয়েতনামের ধানক্ষেতে আজও বাতাস বয়, তোমার স্বপ্ন স্বাধীনতার সংগীতে রূপ লয়। মেকং নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে তোমার স্মৃতির ছাপ, পাহাড়জঙ্গলে উচ্চারিত অবিনাশী আলাপ; মানুষ যতদিন লড়বে শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে, হো চি মিন ততদিন জাগবেন মুক্তির প্রতীকে।

হে আলোর দিশারী তুমি, যুগের মহাকাব্য, তোমার নাম উচ্চারিলে জাগে সংগ্রামশক্তি; অগ্নিস্নাত শতাব্দীর মহান বিপ্লবী প্রাণ, তোমার জীবন মানুষেরই মুক্তির মহাগান। আজকের এই বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়ার পথ, সমতা আর ন্যায়ের জন্য খুঁজে ফেরে রথ; তোমার শিক্ষা সাহস জোগাক জনমানুষের মনে, গণতান্ত্রিক মুক্তির সূর্য উঠুক নতুন দিনে।

যতদিন পৃথিবীজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সারি, যতদিন শাসকের বুটে পিষ্ট হবে নারী, যতদিন বর্ণ ও জাতির নামে হবে বিভাজন, ততদিন তোমার ডাক হবে জাগ্রত আহ্বান। “ভয় কোরো না, মানুষ জাগে ইতিহাসের ডাকে, বিপ্লব মানে মানুষের জয় মানুষেরই পাকে।” এই বাণী নিয়ে এগিয়ে যাক সংগ্রামী মানবজাতি, হো চি মিনের অমর নামে রচিত হোক গাথা অমিত।

লাল সালাম হে বিপ্লবী, লাল সালাম আবার, শোষিত মানুষের হৃদয়ে তুমি অনিবার; রক্তাক্ত পৃথিবীজুড়ে জ্বালো মুক্তির দীপ, তোমার নামে জেগে উঠুক সাম্যের অনুপম সঙ্গীত। মানুষের মন পরাজয় জানে না কোনোদিন, এই মহাসত্য শিখিয়েছ তুমি—হো চি মিন।
—(হো চি মিন,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই মহান এই নেতার জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস, তত্ত্ব ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী।
ভিয়েতনাম মুক্তিসংগ্রামের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি বিপ্লবী নেতা কমরেড হো চি মিন লাল সালাম ও বিপ্লবী অভিবাদন।

#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯

ShareTweetPin

সর্বশেষ সংবাদ

  • সুনামগঞ্জের বিএনপি নেতার ভাতিজাসহ গ্রেফতার ৩
  • উজিরপুরে ভূমি সেবা সপ্তাহ উদ্বোধন
  • ফারাক্কা বাঁধ আধিপত্যবাদের হাতিয়ার, চবিতে চাকসুর আলোচনা সভায় বক্তারা
  • সরিষাবাড়ীতে ভূমি সেবা মেলার শুভ সূচনা ও বর্ণাঢ্য র‌্যালি
  • সালথায় ভূমিসেবা মেলা উপলক্ষে র‍্যালি ও সভা অনুষ্ঠিত

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুর ইসলাম (রাশেদ মানিক)
নির্বাহী সম্পাদক: মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ

বাংলা এফ এম , বাসা-১৬৪/১, রাস্তা-৩, মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ

ফোন:  +৮৮ ০১৯১৩-৪০৯৬১৬
ইমেইল: banglafm@bangla.fm

  • Disclaimer
  • Privacy
  • Advertisement
  • Contact us

© ২০২৬ বাংলা এফ এম

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • বিশ্ব
  • সারাদেশ
  • বিনোদন
  • খেলাধুলা
  • প্রবাস
  • ভিডিও
  • কলাম
  • অর্থনীতি
  • লাইফস্টাইল
  • ক্যাম্পাস
  • আইন ও আদালত
  • চাকুরি
  • অপরাধ
  • বিজ্ঞান প্রযুক্তি
  • ফটোগ্যালারি
  • ফিচার
  • মতামত
  • শিল্প-সাহিত্য
  • সম্পাদকীয়

© ২০২৬ বাংলা এফ এম