সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত নয়, বরং এটি আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল এবং নিষ্ঠুর প্রক্সিওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের এক মহাকাব্য। ২০১১ সালে যে গণঅভ্যুত্থান ছিল সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক মুক্তি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত, তা বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে এক বিশাল মানবিক ট্র্যাজেডিতে।
জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, গত দেড় দশকে সিরিয়ায় লক্ষ লক্ষ বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার একটি বিশাল অংশের জন্য দায়ী আসাদ সরকার ও তার মিত্ররা। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদী এবং পরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক নীলনকশা, যা সাধারণ সিরিয়ানদের জীবনকে দাবার বোর্ডের গুঁটিতে পরিণত করেছে।
সিরিয়ার এই রক্তাক্ত সমীকরণের মূলে ছিল আসাদ রেজিমের দীর্ঘ ৪০ বছরের স্বৈরাচারী শাসন এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন। জনসংখ্যার মাত্র ১২ শতাংশ হয়েও আলাউইত সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র আধিপত্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা এক গভীর সামাজিক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। ২০১১ সালে যখন সাধারণ মানুষ ‘জনগণ শাসকের পতন চায়’ স্লোগান নিয়ে রাজপথে নামে, তখন আসাদ বাহিনী শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালিয়ে বিদ্রোহের আগুনকে সশস্ত্র যুদ্ধে রূপ দেয়। এর পরবর্তী ধাপে মঞ্চে প্রবেশ করে বৈশ্বিক শক্তিগুলো। একদিকে আসাদকে টিকিয়ে রাখতে রাশিয়া ও ইরান তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে, অন্যদিকে আসাদ বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মদদ যোগায় যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার ও ইসরায়েল।
সিরিয়ার এই অস্থিতিশীলতা যে হুট করে আসা কোনো ঘটনা নয়, তার প্রমাণ মেলে ২০০৭ সালে জেনারেল ওয়েসলি ক্লার্কের প্রকাশ করা পেন্টাগনের সেই গোপন মেমোতে, যেখানে সিরিয়াসহ সাতটি দেশের সরকার পতনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ‘ক্লিন ব্রেক’ নীতিপত্রও ইঙ্গিত দেয় যে, ইসরায়েলের আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে সিরিয়াকে অস্থিতিশীল করা ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত কৌশল। এই কৌশলের অংশ হিসেবেই পশ্চিমা ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো সিরিয়ায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয়, যা শেষ পর্যন্ত আল-নুসরা ফ্রন্ট বা আইএসের মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থানকে ত্বরান্বিত করে। অন্যদিকে, রাশিয়া তার কৌশলগত নৌ ও বিমান ঘাঁটি রক্ষা করতে এবং ইরান তার ‘প্রতিরোধের অক্ষরেখা’ ধরে রাখতে আসাদ বাহিনীর পক্ষে নির্বিচারে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান পরিচালনা করে, যাতে প্রাণ হারায় হাজার হাজার নারী ও শিশু।
ক্ষমতার এই নিষ্ঠুর খেলায় প্রতিটি পক্ষই কম-বেশি রক্তে হাত রাঙিয়েছে। আসাদ সরকারের ব্যারেল বোমা ও রাসায়নিক হামলা যেমন বিভীষিকা তৈরি করেছে, তেমনি মার্কিন ও তুর্কি বাহিনীর বিমান হামলায় শত শত বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এমনকি ২০২৪ সালে আসাদের পতনের পর নতুন শাসক আহমেদ আল-শারা যখন ওয়াশিংটনের ‘বাস্তববাদী বন্ধুতে’ রূপান্তরিত হন, তখনও রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে ‘সন্ত্রাসী’র সংজ্ঞা গৌণ হয়ে যায়। আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ায় সংখ্যালঘু আলাউইতদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা কিংবা ইসরায়েলের ব্যাপক বোমাবর্ষণ প্রমাণ করে যে, শাসক বদলালেও সিরিয়ার সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
আসলে সিরিয়ার গণহত্যাকে এককভাবে ইরান বা রাশিয়ার দায় বলে প্রচার করা যতটা সহজ, সামগ্রিক সত্য ততটাই জটিল। যখন আমরা আসাদ বাহিনীর অপরাধকে কাঠগড়ায় দাঁড়াই, তখন গাজা, ইয়েমেন কিংবা আফগানিস্তানে পশ্চিমা ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর চালানো হত্যাকাণ্ডকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি বোমার আঘাত হোক তা আসাদের কিংবা অন্য পক্ষের, শেষ পর্যন্ত বলি হয়েছে সাধারণ মানুষ। সিরিয়ার এই ধ্বংসস্তূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভূ-রাজনীতির নিষ্ঠুর দাবার বোর্ডে যখন রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হয়, তখন উলুখাগড়া হিসেবে কেবল সাধারণ জনগণের জীবনই পিষ্ট হয়। এই যুদ্ধ কোনো পক্ষের জয়ের গল্প নয়, বরং মানব সভ্যতার এক সম্মিলিত পরাজয়ের ইতিহাস।

