মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান এক অত্যন্ত কৌশলী চাল চালল। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি এখন সবার জন্য উন্মুক্ত, তবে শর্ত হলো জাহাজগুলোকে ইরানের নির্দিষ্ট করে দেওয়া পথেই চলতে হবে।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই ইরান এই ঘোষণা দিয়ে কার্যত বিশ্বকে বুঝিয়ে দিল যে, যুদ্ধের মাঠের শর্তগুলো এখন তেহরানই নির্ধারণ করছে। গত সপ্তাহে আমেরিকার সাথে আলোচনার সময় ইরান শর্ত দিয়েছিল যে, সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ হলে তারা হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। ট্রাম্প লেবাননে বোমা হামলা বন্ধের জন্য ইসরায়েলকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর ইরান তার দেওয়া কথা অনুযায়ী এই সীমিত সময়ের জন্য প্রণালিটি উন্মুক্ত করল।
এখানে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও ইরান এই সুযোগকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে। ইরানের সামরিক কর্মকর্তাদের সূত্রমতে, জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের অনুমতি আবশ্যিক এবং প্রতিটি জাহাজ থেকে ইরান নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি (প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার) আদায় করবে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্ডির মতে, আমেরিকা যদি এই জাহাজগুলোকে বাধা দেয়, তবে তারা আসলে নিজেদের মিত্র দেশগুলোকেই (যেমন সৌদি আরব বা কাতার) ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ফলে ইরান কার্যত একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতিতে আছে। এমনকি সিএনএন-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানকে জব্দ করা ২০ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে, যা ইরানের জন্য বড় এক কূটনৈতিক বিজয়।
এদিকে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক অদ্ভুত অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফ্রান্সে পৃথিবীর ৪০টি দেশের নেতাদের উপস্থিতিতে যে আলোচনা হয়েছে, সেখানে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ সরাসরি আমেরিকার ‘সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা’ ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন। মিত্র দেশগুলোর এই পিঠটান ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিমুখী অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করছে। একদিকে তিনি বলছেন ইরানের সাথে চুক্তি হবে, অন্যদিকে বলছেন আবার যুদ্ধে ফিরে যাবেন। এই অবিশ্বাসের কারণেই অধ্যাপক মারান্ডি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরান এখন আর কোনো কাগজে কলমে চুক্তিতে বিশ্বাসী নয়; তারা ‘ফ্যাক্টস অন দ্য গ্রাউন্ড’ বা বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেবে।
সবচেয়ে বড় নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কে। ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ‘PROHIBITED’ শব্দটি ব্যবহার করে ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন, যা স্পষ্টত নেতানিয়াহুর জন্য এক বড় অপমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প সম্ভবত যুদ্ধের যাবতীয় দায়ভার নেতানিয়াহুর ওপর চাপিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইছেন। এই সংকটের ফলে নেতানিয়াহুর ক্ষমতা হারানো এখন কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যদি তিনি ক্ষমতা হারান, তবে আমেরিকার অনেক গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ও রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইরানের সরকার উৎখাত করতে গিয়ে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু নিজেরাই এখন রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।

