ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে বর্তমান উত্তেজনা বিশ্বকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা চিরতরে নির্মূল করতে “ম্যাস ডিস্ট্রাকশন” বা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।
জো কেন্ট কিংবা জন মিয়ারশাইমারের মতো ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে “হিরোশিমা-নাগাসাকি” মডেলের আলোচনার প্রসঙ্গগুলো এই আশঙ্কার পালে হাওয়া দিচ্ছে। তবে সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে এই পথ বেছে নেওয়া ইসরায়েলের জন্য যতটা না বিজয়ের, তার চেয়ে বেশি আত্মঘাতী হওয়ার ঝুঁকি রাখে।
এমআইটি প্রফেসর থিওডোর পোস্টলের বিশ্লেষণটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন যে, ইসরায়েল যদি ইরানে পারমাণবিক হামলা চালায়, তবে ইরান নিশ্চুপ বসে থাকবে না। ইরানের ভূখণ্ড বিশাল এবং তাদের প্রধান সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো মাটির অনেক গভীরে সুড়ঙ্গের ভেতরে সুরক্ষিত। ফলে প্রথম দফার হামলায় ইরানকে পুরোপুরি অকার্যকর করা সম্ভব নয়। বর্তমানে ইরানের কাছে যে পরিমাণ ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যুদ্ধের চরম অবস্থায় তা দ্রুত ৯০% বা ওয়েপন-গ্রেড পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কেবল সময়ের ব্যাপার। ইরানের হাতে থাকা শক্তিশালী ব্যালিস্টিক মিসাইল ভাণ্ডার ব্যবহার করে তারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলে পাল্টা পারমাণবিক আঘাত হানতে সক্ষম।
ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিকূলতা হলো তার ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা। ইরান আয়তনে বিশাল দেশ হলেও ইসরায়েল অত্যন্ত ছোট এবং জনঘনত্ব অনেক বেশি। তেল আবিবের মতো শহরে মাত্র কয়েকটি ছোট কিলোটন শক্তির পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ পুরো দেশটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট। বড় আকারের রেডিয়েশন এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া অগ্নিঝড় ছোট এই দেশটিকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে। অর্থাৎ, ইরানকে ধ্বংস করতে গিয়ে ইসরায়েল কার্যত নিজের অস্তিত্বকেও বিলীন করে দেবে। একে সামরিক ভাষায় “মিউচুয়াল অ্যাসিউর্ড ডেসট্রাকশন” বলা হয়, যেখানে কোনো পক্ষই শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারে না।
এছাড়া এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরান যদি আক্রান্ত হয়, তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ক্ষেত্র এবং তেল রিফাইনারিগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ধসিয়ে দিতে পারে। এতে আমেরিকা সহ সারা বিশ্বের অর্থনীতি কয়েক দশক পিছিয়ে যাবে। রাশিয়ার কড়া হুঁশিয়ারি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসা প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালের সামরিক হিসেবটি অত্যন্ত জটিল। ইসরায়েল মুখে যতই হুমকি দিক না কেন, আমেরিকার সবুজ সংকেত এবং নিজেদের সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি উপেক্ষা করে এককভাবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব একটি সিদ্ধান্ত। শেষ পর্যন্ত এটি একটি “ডেডলক” পরিস্থিতি, যেখানে এক পক্ষ অস্ত্র চালানো মানেই নিজের পরাজয় নিশ্চিত করা।

