রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের হাজীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ৬৭ বছর বয়সী মনছুর আলী। স্থানীয়দের কাছে তিনি মন্ত্রী মনছুর নামে পরিচিত, কিন্তু জীবনের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার ভাগ্যে জোটেনি নিজের একটি বসতঘর। প্রায় ৫ দশক ধরে তিনি অন্যের জমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে কোনোভাবে দিন কাটাচ্ছেন।
বর্তমানে মনছুর আলী তার স্ত্রীকে নিয়ে হাজীপাড়া গ্রামে মৃত শাহ শামছুল হুদার ছেলে লিটু আনামের জমির এক কোণে জরাজীর্ণ একটি টিনের ঘরে বসবাস করছেন। ঘরটি খড়কুটো ও পাটকাঠির বেড়া দিয়ে ঘেরা। দূর থেকে দেখলে সেটি একটি গোয়ালঘর বলেই মনে হয়। ভাঙা শড়ীর, অনিশ্চিত জীবন মনছুর আলীর স্ত্রী ও এক মেয়ে নিয়ে ছোট হলেও কষ্টের শেষ নেই সংসারে। অনেক আগেই তাদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে একই ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া এলাকায়।
এখন বৃদ্ধ দম্পতির জীবনের ভার যেন আরও বেড়ে গেছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মনছুর আলী দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছেন। কিন্তু অর্থের অভাবে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না। সংসার চালানোর জন্য তার স্ত্রী গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। তবুও তাদের সংসার ঠিকমতো চলে না।
শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন যে এখন তিনি ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে পারেন না, সম্প্রতি মনছুর আলী তার জীবনের কষ্টের কথা তুলে ধরেন সাংবাদিকদের কাছে। তিনি বলেন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যদি একটা সরকারি ঘর পেতাম, তাহলে শান্তিতে থাকতে পারতাম। রাতে ঘুমানোর জন্য একটা আশ্রয় পেলেই হয়। আল্লাহ আপনাদের ভালো করবেন।
তিনি আরও জানান, আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় একটি ঘর পাওয়ার আশায় চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ বিভিন্ন মানুষের কাছে বহুবার আবেদন করেছেন। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই ঘরটি তার ভাগ্যে জোটেনি। সরকারি কোনো সহায়তাও পাননি তিনি। এ বিষয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুন্নবী নিপুল বলেন,’ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ নিয়েও বাণিজ্য করেছেন। মনছুর আলীর মতো অনেক ভূমিহীন মানুষ ঘর পাননি।
বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।’লোহানীপাড়া ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য জুলফিকার সরকার বলেন, ‘মনছুর আলীর দুর্দশার কথা বলতে গেলে নিজেরও খুব কষ্ট লাগে। এত বছর ধরে একজন মানুষ এভাবে কষ্টে থাকবেন—এটা মেনে নেওয়া যায় না। গ্রামবাসীরা জানান, আশ্রায়ন প্রকল্প বা সরকারি সহায়তা পাওয়ার আশায় মনছুর আলী বহুবার জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন মানুষের দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু অর্থের অভাবে তার সেই আশাও পূরণ হয়নি।
লোহানীপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া শাহ আশরাফুল ইসলাম রানা বলেন,’মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমি মনছুর আলীকে বাড়ি করার জন্য কিছু জায়গা দিয়েছি। স্কুল শিক্ষক আফজাল হোসেন বলেন, মনছুর আলীর জীবনের এই দীর্ঘ সংগ্রাম আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতাকে সামনে এনে দেয়।
সরকারি সহায়তা যদি প্রকৃত অসহায় মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাত তাহলে হয়তো তাকে এত বছর অন্যের জমিতে মানবেতর জীবন কাটাতে হতো না। আশ্রায়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ভূমিহীন মানুষের মাথার উপর একটি স্থায়ী ছাদ নিশ্চিত করা। সমাজের সচেতন মানুষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের উচিত মনছুর আলীর মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ন্যূনতম আশ্রয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

