বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। বইমেলার ভেতরে তখন মানুষের ভিড়—কেউ বই দেখছে, কেউ পছন্দের লেখকের খোঁজ করছে, আবার কেউ শুধু ঘুরে ঘুরে মেলার গন্ধটা নিতে এসেছে। এই ভিড়ের মাঝেই ধীর পায়ে হাঁটছিলেন মিরপুর মডেল একাডেমির শিক্ষক বিপুল দাস। তাঁর পাশে তাঁর ছেলে, মিরপুর এসওএস হারমেন মেইনার স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সৌমিত্র দাস।
ভিড় ঠেলতে ঠেলতে স্টলের সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে বিপুল দাসের ভীষণ ভালো লাগে। বহু বছরের অভ্যাস। কিন্তু এবার মেলায় সেই চেনা ভিড়টা যেন নেই। একটু আক্ষেপের সুরেই তিনি বললেন,
“ভিড় ঠেলতে ঠেলতে হাঁটার যে মজা, সেটা এবার নেই। তবে মেলার পরিবেশটা মোটামুটি ভালোই।”
বিকেলের দিকে মেলায় ঢুকেছিলেন বাবা–ছেলে। বই দেখতে দেখতে তারা পৌঁছান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্টলের সামনে। বিপুল দাস বাংলা একাডেমি থেকে নিজের জন্য কিনেছেন সৈয়দ মকসুদ আলীর লেখা প্লেটোর রিপাবলিক। আর ছেলের জন্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে তুলে নেন পরশুরাম গল্পসমগ্র।
এদিকে আজ শুক্রবার মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায় শিশুপ্রহর দিয়ে। বেলা ১টা পর্যন্ত থাকবে এই শিশুপ্রহর, এরপর মেলা চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিক্রেতাদের আশা, আজ হয়তো বেচাকেনার মন্দাভাব কিছুটা কেটে যাবে। কারণ গত কয়েক দিনে মেলায় বিক্রি খুব একটা ভালো হয়নি। শুধু গল্প–উপন্যাস বা গবেষণাধর্মী বই নয়, প্রায় সব ধরনের বইয়ের বিক্রিই কমে গেছে। এমনকি রমজান মাস চললেও ইসলামি বইয়ের বিক্রিও আশানুরূপ নয়।
ইসলামি বইয়ের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দারুস সালাম বাংলাদেশের স্টলে কথা হলো ব্যবস্থাপক মুশফিকুল হকের সঙ্গে। তিনি কিছুটা হতাশ কণ্ঠে বললেন,
“আজ সারাদিনে মাত্র এক হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে।” তাঁদের স্টল থেকে বিক্রি হয়েছে ড. মরিস বুকাইলির বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান এবং শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক সিরিজ গল্পে গল্পে ছোটদের ৩৬৫ দিন।
তবে নতুন বই আসা থেমে নেই। গতকাল মেলার তথ্যকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী নতুন বই এসেছে ৯২টি। প্রথমা প্রকাশনের স্টলে নতুন এসেছে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী: ১৯৯৬–২০১০। পাশাপাশি আশানুর রহমানের দুটি নভেলা—প্রথম প্রেম ও ছায়ার আঙিনা।
প্রথমা প্রকাশনের বিক্রয় প্রতিনিধিরা জানালেন, আগে প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে আকবর আলি খানের পুরানো সেই দিনের কথা এবং মশিউল আলমের উপন্যাস দ্বিতীয় খুনের কাহিনি ভালো বিক্রি হচ্ছে।
মেলার নতুন বইয়ের তালিকাও বেশ সমৃদ্ধ। অবসর প্রকাশন এনেছে হরিশংকর জলদাসের উপন্যাস কচদেবযানী। আগামী প্রকাশনী এনেছে আবিদ আনোয়ারের কাব্যগ্রন্থ সন্ন্যাসীরা গাজন থামা। নালন্দা এনেছে সারওয়ার–উল–ইসলামের ছড়ার বই অন্ধকারের বৃষ্টি। পাঞ্জেরী এনেছে পিয়াস মজিদের নির্বাচিত কবিতা। প্রতিভাষা প্রকাশন এনেছে পল্লব মোহাইমেনের তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বই প্রযুক্তির এই দিনে।
অনন্যা প্রকাশ করেছে ফরিদুর রেজা সাগরের ‘ছোটকাকু’ সিরিজের বই মেহেরপুরের মোহর। অনুপম এনেছে মোরশেদ শফিউল হাসানের জীবনীবিষয়ক গ্রন্থ মহাজীবনের কথা। ঐতিহ্য প্রকাশ করেছে শারমিন আহমদ ও সোহেল তাজের স্মৃতিচারণামূলক বই শতাব্দীর কণ্ঠস্বর তাজউদ্দীন আহমদ: কন্যার চোখে পুত্রের চোখে। ইউপিএল এনেছে সৈয়দ শাহরিয়ার রহমানের ভাষাবিষয়ক গবেষণা পরাভাষা প্রকরণ কথনবিশ্ব এবং স্বপ্ন–৭১ প্রকাশন এনেছে আশরাফুল ইসলামের ভ্রমণগদ্য ভদ্রাবতীর পাড়ে।
মেলার আলোচনায় বিশেষভাবে জায়গা করে নিয়েছে মতিউর রহমানের বই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী: ১৯৯৬–২০১০। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা বরাবরই সংবেদনশীল বিষয়। প্রকাশ্যে এ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা না হলেও মানুষের মধ্যে কৌতূহল সব সময়ই থাকে।
দেশের ইতিহাসে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক প্রায়ই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের নানা অধ্যায় পেরিয়ে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর এই সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেনাবাহিনী কতটা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে বইটিতে।
১৯৯৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা এবং তার সঙ্গে দেশের রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে গ্রন্থভুক্ত লেখাগুলোতে। মতিউর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মিশেলে তৈরি এসব লেখা যখন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, তখনই পাঠকদের মধ্যে বেশ আলোড়ন তুলেছিল।
মেলার ভিড়ের মধ্যে বই হাতে দাঁড়িয়ে থাকা বিপুল দাস ও তাঁর ছেলে সৌমিত্রের মতো অনেকেই হয়তো সেদিন শুধু বই কিনছিলেন না—তারা খুঁজছিলেন গল্প, ইতিহাস আর ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। বইমেলার প্রতিটি স্টলে যেন সেই গল্পই লেখা হচ্ছে নতুন করে।

