মঙ্গলবার ভোরে দোহার আকাশে আবারও বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছিল নিয়ামত উল্লাহর ছোট্ট ভাড়া বাসাটি। মোবাইলে আগের মতো আর সতর্কবার্তা আসে না। অথচ মাথার ওপর দিয়ে ছুটে যায় আগুনের রেখা। দূরে কোথাও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেগুলো প্রতিহত করলে আকাশে ঝলসে ওঠে আলো। তিনি জানেন না ঠিক কোথায় আঘাত হানছে, শুধু জানেন—এই যুদ্ধ এখন তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আজ অস্থির। ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলর যৌথ হামলার জবাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটির দিকে। সেই পাল্টা হামলার প্রভাব পড়েছে কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন জুড়ে। কোথাও বিমান চলাচল বন্ধ, কোথাও সাময়িক স্থগিত। আকাশে যুদ্ধবিমান, নিচে আতঙ্ক।
দোহায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করা নিয়ামত বলছিলেন, গত শনিবার থেকে নির্দিষ্ট সময় ধরে হামলা দেখেছেন—ভোরে, দুপুরে, সন্ধ্যায়। এখন আর কোনো নিয়ম নেই। যখন-তখন আকাশ চিরে মিসাইল যায়। হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা রাজধানী ছেড়ে সীমান্তের দিকে চলে গেছে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রবাসী বাংলাদেশি এখনো দোহাতেই—অপেক্ষায়, উদ্বেগে।
একই সময়ে কুয়েত সিটিতে মাহফুজ রাকিব সাইরেনের শব্দে ঘুম ভাঙার কথা বলছিলেন। “মাথার ওপর দিয়ে মিসাইল যাচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়িনি,” তিনি বললেন। গাড়িচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক মিসাইল প্রতিহত করছে, কিন্তু প্রতিবারই বিস্ফোরণের শব্দে মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আবার দৌড়ে ঢুকে পড়ছে।
দুবাইয়ের এক শপিং মলে কাজ করেন আসিফ মাইনুদ্দিন বাপন। মধ্য রমজানে যেখানে মানুষের ঢল নামে, সেখানে এখন ফাঁকা করিডোরে প্রতিধ্বনি শোনা যায়। “জেট বিমান গেলে বিকট শব্দ পাই, কিন্তু মিসাইলগুলো রাতে শুধু আলো হয়ে ছুটে যায়,” বলছিলেন তিনি। ক্রেতা কমে গেছে, বিক্রি কমেছে, অথচ বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ।
দুবাইয়ের নাজোয়া কবির হিসাব কষে দেখালেন—যে আলু একসময় দেড় দিরহাম ছিল, এখন আট। কাঁচামরিচ ৮–৯ থেকে ২০ দিরহাম। পিয়াজ, টমেটো—সবই লাফিয়ে বেড়েছে। জেদ্দার ব্যবসায়ী জিয়াউল হক জিয়া বললেন, যেই সুপারশপে ডিসকাউন্টে চাল-ডাল কিনতেন, সেখানে এখন ছাড় নেই; কিছু পণ্যের দামও বেড়েছে।
এই যুদ্ধ শুধু আকাশে নয়, মানুষের ভেতরেও চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ লাইভে এসে আকাশের দৃশ্য দেখাচ্ছেন, কেউ আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস সতর্ক করে দিয়েছে—ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দৃশ্য ধারণ বা প্রচার না করতে।
এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত দুইজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আজমানে একটি বেসামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলায় সালেহ আহমেদ নামে এক প্রবাসী প্রাণ হারিয়েছেন; তাঁর বাড়ি সিলেটের বড়লেখায়। বাহরাইনেও নিহত হয়েছেন আরেক বাংলাদেশি, যার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। কুয়েতে একটি বেসামরিক বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন হামলায় আহত হয়েছেন আরও চারজন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কাতার এক মাসের জন্য ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ বিমান মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট স্থগিত করায় অনেক শ্রমিক বিমানবন্দর থেকে ফিরে এসেছেন; সরকার বিকল্প সমাধানের চেষ্টা করছে।
নিয়ামত উল্লাহ রাতে ছাদে ওঠেন না আর। মাহফুজ সাইরেন শুনলেই ফোন হাতে নেন—পরিবারকে জানাতে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। দুবাইয়ের শপিং মলে আসিফ দাঁড়িয়ে থাকেন প্রায় খালি ফ্লোরে। প্রত্যেকেই একই প্রশ্নে ভুগছেন—এই যুদ্ধ কতদিন?
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। সেই বাজারের আকাশে এখন ধোঁয়া আর অগ্নিরেখা। আর হাজার মাইল দূরের গ্রামগুলোতে অপেক্ষা করছে পরিবার—একটি ফোনকলের জন্য, একটি আশ্বাসের জন্য, অথবা কেবল এই খবরের জন্য যে প্রিয়জন এখনো নিরাপদ আছে।

