লিখেছেন : কৌশিক দত্ত

ভ্রমণের প্রতি আমার দুর্বলতা নতুন নয়। কিন্তু কিছু সফর থাকে, যেগুলো কেবল ঘোরাঘুরি নয়— অনুভব, ইতিহাসের ছোঁয়া আর মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে যাওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের এই একদিনের সফরটি ছিল তেমনই— ছোট সময়ের মধ্যে বহুমাত্রিক এক ভ্রমণ। আমরা যাঁরা ঢাকায় থাকি তাঁদের জন্য টাঙ্গাইল হতে পারে এমন একটি গন্তব্য, যেখানে একদিনের মধ্যে ঘুরে দেখার সব আনন্দ উপভোগ করে আবার স্বাচ্ছন্দ্যে ঢাকায় ফিরে আসা যায়। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল শহরের দূরত্ব সড়কপথে আনুমানিক ৯৫–১০৫ কিলোমিটার (রুটের উপর নির্ভর করে কিছুটা কম-বেশি হতে পারে)।
ভোরের ঢাকা, রওনা টাঙ্গাইলের পথে
একদম ভোরবেলা। ঢাকার আকাশ তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। হালকা কুয়াশা, ফাঁকা রাস্তা আর চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা কাপে দিনের প্রথম চুমুক— এমন আবহেই মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা যাত্রা আরম্ভ করি মেরুল বাড্ডা থেকে । প্রাইভেট কারে চেয়ে রওনা হলেও রাস্তায় জ্যাম এবং গাড়ির গতি ধীর হওয়ায় আমাদের পৌঁছতে সময় লেগে যায় প্রায় আড়াই ঘন্টা । শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে গাড়ি যখন এগোতে শুরু করল, তখন জানালার বাইরে ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল দৃশ্যপট।
উঁচু দালান মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিল সবুজ ক্ষেত, নদীর সেতু, মাটির ঘর আর সকালের আলোয় জেগে ওঠা গ্রামবাংলা। প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম টাঙ্গাইলের মহেরা অঞ্চলে।
আধ্যাত্মিক সূচনা: ছাওয়ালি শ্মশান কালী মন্দির

মহেরা জমিদার বাড়িতে যাওয়ার আগেই আমরা থামলাম ঐতিহ্যবাহী ছাওয়ালি শ্মশান কালী মন্দিরে। স্থানীয়দের কাছে এটি অত্যন্ত পবিত্র একটি স্থান। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই মন্দিরের ইতিহাস ঘিরে রয়েছে বহু লোককথা ও বিশ্বাস।
মন্দিরে ঢুকতেই যে দৃশ্যটি আমাদের স্থির করে দিয়েছিল তা হলো বিশাল ২১ হাত উচ্চতার কালী প্রতিমা। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ কালী মূর্তি হিসেবে পরিচিত এই প্রতিমা সামনে দাঁড়িয়ে দেখার অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দেবীর তেজস্বী দৃষ্টি, বিস্তৃত ভঙ্গি আর শৈল্পিক নির্মাণ, সব মিলিয়ে এক মহিমান্বিত উপস্থিতি।
শ্মশানকালী হওয়ায় পরিবেশে এক ধরনের গম্ভীরতা রয়েছে। ঘণ্টাধ্বনি, ধূপের গন্ধ আর ভক্তদের প্রার্থনা মিলিয়ে জায়গাটি যেন আধ্যাত্মিক আবহে মোড়া। আমরা প্রণাম জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলাম। ভ্রমণের শুরুটা এমন এক গম্ভীর, শান্ত পরিবেশে হওয়ায় দিনটি যেন অন্য মাত্রা পেয়েছিলো।
ঐতিহ্যের মহিমা: মহেরা জমিদার বাড়ি

মন্দির থেকে বেরিয়ে অল্প দূরেই আমাদের পরবর্তী গন্তব্য— ঐতিহাসিক মহেরা জমিদার বাড়ি।
১৮৯০ সালে নির্মিত এই প্রাসাদ কেবল একটি জমিদার বাড়ি নয়, বরং একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। বিশাল ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সুবিশাল প্রাঙ্গণ, সুসজ্জিত বাগান আর পুকুর। চারটি পৃথক ভবন। মহেরা লজ, আনন্দ লজ, চৌধুরী লজ ও কালীচরণ লজ, প্রতিটিই নান্দনিক ও স্বতন্ত্র। স্থাপত্যশৈলীতে ইউরোপীয়, বিশেষত স্প্যানিশ ও মুরিশ ধারার প্রভাব স্পষ্ট। খিলানযুক্ত দরজা-জানালা, অলংকৃত বারান্দা, ভারসাম্যপূর্ণ সম্মুখভাগ,সব মিলিয়ে এক রাজকীয় আবহ। শুনেছি, স্পেনের কর্ডোভা অঞ্চলের স্থাপত্যরীতির অনুপ্রেরণায় এই নকশা করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই প্রাসাদ আক্রমণের শিকার হয়েছিল। ইতিহাসের সেই কঠিন সময়ের নীরব সাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে ভবনগুলো। প্রাসাদের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, যেন অতীতের কোনো গৌরবময় অধ্যায়ে ঢুকে পড়েছি।
বিস্ময়ের স্থাপত্য: ২০১ গম্বুজ মসজিদ
মহেরা থেকে বেরিয়ে আমরা রওনা দিয়েছিলাম বিখ্যাত ২০১ গম্বুজ মসজিদ–এর দিকে। দূর থেকেই চোখে পড়ে সাদা গম্বুজের সারি। ২০১ গম্বুজ মসজিদ হলো বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার নগদা শিমলা ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে অবস্থিত একটি মসজিদ। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গম্বুজ এবং দ্বিতীয় উচ্চতম মিনার বিশিষ্ট মসজিদ হিসাবে স্বীকৃত। ২০১৩ সালের জানুয়ারি এই মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এই মসজিদের প্রধাণ বিশেষত্ব তার নামেই— ২০১টি গম্বুজ ও ৯টি মিনার। প্রধান গম্বুজটির উচ্চতা প্রায় ৮১ ফুট। বিশাল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মসজিদের দিকে তাকালে মনে হয় যেন স্থাপত্যের এক অপূর্ব শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ধর্মীয় স্থাপনার গাম্ভীর্য আর নান্দনিক নির্মাণ মিলিয়ে এটি এখন টাঙ্গাইলের অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। প্রার্থনার সময় না হলেও ভেতরের পরিবেশে ছিল এক ধরনের শান্তি এবং পবিত্রের মিশেলে পরিপূর্ণ।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে: মিষ্টিপট্টি ও চমচমের স্বাদ
টাঙ্গাইল শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছতে পৌঁছতে সূর্যিমামা একেবারে মাথার উপর । পেটও ক্ষুধায় চুচু … ফলে স্থানীয় এক রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে কাল বিলম্ব না করেই চলে গিয়েছিলাম টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী “আদিকালী মিষ্টান্ন ভান্ডার।
গরম গরম চমচমের প্লেট সামনে আসতেই বোঝা গেল, কেন এই মিষ্টির এত খ্যাতি। বাইরের হালকা শক্ত আবরণ, ভেতরে নরম ও রসালো মিষ্টতা,এক টুকরোতেই যেন শত বছরের ঐতিহ্যের স্বাদ।
স্বর্গীয় পরেশ চন্দ্র কর নামে একজন পাঁচআনি বাজারে প্রথম স্থায়ী মিষ্টির দোকান দেন। এরপর খোকা ঘোষ ১৯৩৯ সালে দেন ‘জয়কালী মিষ্টান্ন ভান্ডার’ নামের এক মিষ্টির দোকান। পরে আরও কয়েকজন বেশ কয়েকটি দোকান দেন এই বাজারে। এভাবে মিষ্টির দোকানের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে একসময় বাজারের উত্তর-পূর্ব অংশটি ‘মিষ্টিপট্টি’ নামে পরিচিতি পায়।
প্রায় ২০টির মতো মিষ্টির দোকান মিলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ মণ মিষ্টি বিক্রি হওয়, যা এই অঞ্চলয়,মিষ্টির জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
শেষ পর্বেঃ বুকভরা প্রশ্বাসের সাথে সবুজ বনে হারিয়ে যাওয়া
দিনের শেষভাগে আমরা রওনা দিয়েছিলাম মধুপুর এর দিকে। শহরের কোলাহল ছেড়ে রাস্তা ধীরে ধীরে মিশে গিয়েছিল চির সবুজ প্রকৃতিতে । টাঙ্গাইল জেলা শহর থেকে ময়মনসিংহ যাবার পথে রসুলপুর মাজার নামক স্থানে গিয়ে মধুপুর জাতীয় উদ্যানের প্রধান ফটক পড়ে বামদিকে ।মধুপুরের বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেয়। সারি সারি গাছ,আনারস বাগান, মাটির গন্ধ, পাখির ডাক সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন বহুদিনের শহুরে ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর করে দিয়েছিলো।
মধুপুর জাতীয় উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ দৃষ্টি-নন্দন শাল গাছ, যা স্থানীয়দের মতে কয়েক’শ বছরের পুরনো। বিস্তৃত প্রায় ৮৪,৩৬৬ হেক্টর আয়তনের পত্রঝরা এই বনটি ১৯৬২ সালে বন বিভাগের অধীনে আসে এবং ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী আইনের ভিত্তিতে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সরকার মধুপুর বনকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। উদ্যানের মধ্য দিয়ে বংশী নদী প্রবাহিত হওয়ায় এখানে এক ধরনের বিশেষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় উদ্যানের ভেতরে এবং এর আশেপাশে গারো, কোচ, বামনসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের নিবিড় বসবাস ।
সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছিল, তখন সেই সোনালি আলোয় সবুজ বনভূমি যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছিলো। বাবা, মা আর আমি মিলে প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, দিনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা এক সুতোয় একে একে গাঁথা হয়ে গিয়েছিলো ।
এক দিনের ভ্রমণ, বহু দিনের স্মৃতি
ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল দূরত্বে খুব বেশি নয়। কিন্তু অভিজ্ঞতায় ছিল অসীম বিস্তার।
একদিনের সফর হলেও মনে হয়েছে, যেন সময়ের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ এক যাত্রা করলাম। টাঙ্গাইল কেবল একটি জেলা নয়,এটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, স্বাদ আর প্রাণ- প্রকৃতির এক অপূর্ব সমাহার।
তবে মধুপুরের নীরব সেই সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল ভ্রমণ শেষ হয়নি, বরং শুরু হলো আরেকটি নতুন প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা।

