দেওয়ান মাসুকুর রহমান, নিজস্ব প্রতিনিধি:
বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাশিয়ান ফেডারেশনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআরএফ) নেতা এবং দলের কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান কমরেড গেনাদি জ্যুগানভ বলেন, আজকে নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ঠিক ১৯৪৫ সালের মতোই সাহস ও ঐক্যের প্রয়োজন—যখন সোভিয়েত জনগণ ২ কোটি ৭০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে হিটলারের জার্মানিকে চূর্ণ করেছিল।
“কেবল কমিউনিস্টরাই ফ্যাসিস্টদের পরাজিত করেছিল”
ফোরামের উদ্বোধন করতে গিয়ে কমরেড জ্যুগানভ মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধে (Great Patriotic War) কমিউনিস্টদের নিষ্পত্তিমূলক ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। এই রাজনীতিবিদ জোর দিয়ে বলেন:
“১৯৪৫ সালের মে মাসে আমরা যখন বার্লিনে আক্রমণ চালিয়ে ফ্যাসিস্ট দানবকে তার নিজের আস্তানায় শেষ করে দিয়েছিলাম, তখন প্রতি দশজন সৈন্যের মধ্যে সাতজনই ছিলেন কমিউনিস্ট এবং কমসোমল (কমিউনিস্ট যুব লীগ) সদস্য।”
তিনি উল্লেখ করেন যে, সোভিয়েত জনগণ বিশ্বাস করেছিল তারা এই “বাদামী প্লেগ” (ফ্যাসিবাদ)-এর চিরতরে অবসান ঘটিয়েছে। কিন্তু কমরেড জ্যুগানভের দাবি অনুযায়ী, “অ্যাংলো-স্যাক্সনরা শান্ত হয়নি।” তার মতে, পশ্চিমা শক্তিগুলো একটি সমৃদ্ধ সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের বুকে “বান্দেরা সংক্রমণ” (ইউক্রেনীয় উগ্র জাতীয়তাবাদ) লালন-পালন করেছে।
২০১৪ সালের অভ্যুত্থানের আগের ইউক্রেনীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে সিপিআরএফ নেতা বলেন, “এটি ছিল একটি সমৃদ্ধ প্রজাতন্ত্র, মহান সোভিয়েত দেশের জীবনের একটি আদর্শ রূপ, যেখানে ৫ কোটিরও বেশি মানুষ বাস করতেন, যেখানে সেরা বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং জাহাজ তৈরি হতো। এখানকার মানুষ ছিলেন সম্পূর্ণ শিক্ষিত এবং সেখানে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও সমৃদ্ধ জীবন ছিল।”
তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এই সমস্ত কিছুকে এখন “একটি রক্তক্ষরণজনিত ক্ষত—একটি নাৎসি আস্তানায় পরিণত করা হয়েছে, যা এখন পুরো গ্রহ জুড়ে তাদের সন্ত্রাসী বিস্তার ঘটাচ্ছে।”
বৈশ্বিক অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাশিয়াকে বিশাল মূল্য দিতে হচ্ছে, কমরেড জ্যুগানভ মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধের শিকার এবং আজকের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে একটি সরাসরি যোগসূত্র টেনেছেন। তিনি ফোরামের অংশগ্রহণকারীদের বলেন, “আজকে এই বৈশ্বিক অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করতে আমাদের বিশাল মূল্য দিতে হচ্ছে।”
এই রাজনীতিবিদ জোর দিয়ে বলেন যে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বিশেষ গুণের প্রয়োজন।
কমরেড জ্যুগানভ বলেন, “আমাদের খুব ভালো করে বুঝতে হবে: সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে আপনার ইচ্ছা, অনন্য অভিজ্ঞতা এবং নিজের ইতিহাসের জ্ঞান থাকতে হবে। পাশাপাশি এই সংগ্রামে জনগণকে যতটা সম্ভব ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করতে হবে।”
তার মতে, বড় পুঁজি গত এক শতাব্দী ধরে ফ্যাসিবাদী সংগঠন তৈরি করছে, বর্বরতায় অর্থায়ন করছে এবং আজ বিশ্বজুড়ে “মন্দ ও সহিংসতা” ছড়াচ্ছে। এই ধারণাটি তুলে ধরার জন্য ফোরামের অংশ হিসেবে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেখানে দেখানো হয় যে, গত ১০০ বছরে সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা ৩৫টি রাষ্ট্র আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রায় ৫০টি দেশে “রঙিন বিপ্লব” (colour revolutions) ঘটানো হয়েছে।
এই আয়োজনে বাংলাদেশ থেকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি কমরেড সাজ্জাদ জহির চন্দনা ২৪ মে থেকে শুরু হওয়া এই পাঁচ দিনব্যাপী সম্মেলনটি আগামী ২৮ মে পর্যন্ত চলবে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক হুমকি মোকাবেলার কৌশল নির্ধারণই এই সম্মেলনের মূল এজেন্ডা। সম্মেলনের প্রাথমিক অধিবেশনগুলো থেকে একটি অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্ত গৃহতি হয়েছে- মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উত্থান রুখতে একটি ঐক্যবদ্ধ আন্তর্জাতিক ফ্রন্ট গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। আগামী বছরের জন্য আন্তর্জাতিক শান্তি আন্দোলনের কৌশলগত পথনকশা ও যৌথ ঘোষণা চূড়ান্ত করতে ফোরামের অন্যান্য অধিবেশনগুলো আগামী দিনগুলোতেও চলমান থাকবে।

