সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার):
টানা ভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলা সদর,রাজনগর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে অন্তত ৯ হাজার ৯৯৮টি পরিবারের প্রায় ৩৮ হাজার ১৭২ জন মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বন্যার পানিতে ডুবে রাজনগরে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে সড়ক,কালভার্ট,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি তলিয়ে গিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে,জেলার ৪২টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ৯৫৮ জন আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত মানুষের জন্য ৫ টন চাল,৫ লাখ টাকা নগদ সহায়তা এবং ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১১টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। বন্যার কারণে জেলার ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের বাসিন্দা আশরাফ আলী ওরফে আশাই মিয়া (৭০) বন্যার পানিতে ডুবে মারা যান। স্থানীয় সূত্র জানায়,পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ স্থানে চলে গেলেও তিনি বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। পরে ভাঙ্গারহাট-আকুয়া এলাকার রিং বাঁধের পাশ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পাহাড়ি ঢলে বৃহস্পতিবার রাতে রাজনগরের টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর ও হরিপাশা এলাকায় মনু নদীর সুরক্ষাবাঁধ ভেঙে যায়। এতে উজিরপুর,হরিপাশা,ইব্রাহিমপুর,কাছারি, একামধু,কান্দিরকুল,পণ্ডিতনগরসহ অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এছাড়া রামভদ্রপুর,সালোন, পাইকপাড়া,দেফলুড়া,গণেশপুর,আকুয়া, কোনাগাঁও,তাগারপুর ও ভাঙ্গারহাটসহ আশপাশের আরও কয়েকটি এলাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের মোখাবিল এলাকায় ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে ইসলামপুর,আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। রাতের আঁধারে ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়। বন্যার পানিতে আসবাবপত্র,খাদ্যশস্য ও গৃহস্থালির মালামালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বন্যার কারণে মাধবপুর-শ্রীমঙ্গল সড়কের নূরজাহান চা-বাগান এলাকায় একটি কালভার্ট ভেঙে গেছে। আদমপুর-ইসলামপুর সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান,বাঁধ ভেঙে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রবল স্রোতে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পাননি। দুর্গত এলাকার বহু মানুষ এখনও খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ জানান,উজানে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় শনিবার (১১ জুলাই) সকাল থেকে জেলার নদ-নদীর পানি নামতে শুরু করেছে। মনু নদীর পানি এখনও কয়েকটি পয়েন্টে বিপদসীমার সামান্য ওপরে থাকলেও ধলাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে এখনও পানি প্রবেশ করায় কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা অব্যাহত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের কাজ চলছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া বলেন,পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যাবে। প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।

