নুরী আক্তার মুন, ডেস্ক রিপোর্ট :
বাথরুমে অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার পর ১০ বছরের স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলেন এক নারী—হংকংয়ে ঘটেছে এমনই এক বিরল ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শুনতে কোনো সায়েন্স ফিকশন বা হাস্যকর মিম মনে হলেও, তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে বাথরুমে অতিরিক্ত শারীরিক চাপ প্রয়োগ করে নিজের জীবনের মূল্যবান ১০ বছরের স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলেন এক নারী। ২০১৯ সালে হংকংয়ে ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি সম্প্রতি চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে আবারও আলোচনায় এসেছে।
ঘটনার বিবরণ
তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্যে (Constipation) ভোগা ওই নারী বাথরুমে গিয়ে মলত্যাগের জন্য প্রচণ্ড শারীরিক চাপ প্রয়োগ করেন। বাথরুম থেকে বের হওয়ার পরপরই তার পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্য করেন যে, তিনি গত ১০ বছরের কোনো ঘটনাই মনে করতে পারছেন না। তিনি তার পরিবারকে চিনতে পারছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিলেন, কিন্তু গত এক দশকে তার জীবনে কী কী ঘটেছে—সেসব তথ্য তার মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে গিয়েছিল।
চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা ও টিজিএ (TGA)
তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। তারা জানান, ওই নারী ‘ট্রানজিয়েন্ট গ্লোবাল অ্যামনেসিয়া’ (Transient Global Amnesia – TGA) নামক একটি বিরল স্নায়বিক অবস্থার শিকার হয়েছেন। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে একজন মানুষের মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে নতুন স্মৃতি তৈরি করতে পারে না এবং পুরনো কিছু স্মৃতি হারিয়ে ফেলে।
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা: ভ্যালসালভা ম্যানুভার
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, মলত্যাগের সময় বা ভারী কিছু তোলার সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ভ্যালসালভা ম্যানুভার’ (Valsalva Maneuver)। যখন কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে কেউ এভাবে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করেন, তখন তার পেটে এবং বুকে উচ্চ চাপের সৃষ্টি হয়। এই আকস্মিক চাপের ফলে হৃৎপিণ্ড থেকে মস্তিষ্কের দিকে রক্ত প্রবাহিতকারী শিরাগুলোতে সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়।
মস্তিষ্কের স্মৃতি ধরে রাখার মূল কেন্দ্র হলো ‘হিপোক্যাম্পাস’ (Hippocampus)। সাময়িক এই চাপের কারণে হিপোক্যাম্পাসে কয়েক মুহূর্তের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও রক্ত না পৌঁছালে সেটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। অনেকটা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ‘শর্ট-সার্কিট’-এর মতো মস্তিষ্কের এই অংশটি সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে, যার ফলে স্মৃতিভ্রংশের মতো ঘটনা ঘটে।
স্মৃতি ফিরে পাওয়া
স্বস্তির বিষয় হলো, হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকার প্রায় ৮ ঘণ্টা পর ওই নারীর মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়। এর পরপরই তিনি তার হারিয়ে যাওয়া ১০ বছরের স্মৃতি ফিরে পান। তবে স্মৃতি ফিরে এলেও স্নায়বিক ধাক্কার কারণে তিনি বেশ কয়েকদিন দুর্বল অনুভব করেছিলেন।
সতর্কতা
চিকিৎসকরা এই ঘটনাটিকে শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপের কুফল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য অবহেলা করা উচিত নয়। মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া কেবল স্মৃতিশক্তি নয়, বরং ব্রেইন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। শরীরের যেকোনো অস্বাভাবিক চাপ যে স্নায়ুতন্ত্রের ওপর কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে, হংকংয়ের এই নারী তার এক জীবন্ত প্রমাণ।

