চু্য়াডাঙ্গা প্রতিনিধি :
চু্য়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন স্বামী। সংসারে নেই কোনো উপার্জন, মাথার ওপর কয়েক লাখ টাকার ঋণ। শেষ পর্যন্ত স্বামীর চিকিৎসা চালিয়ে নিতে নিজের শরীরের একটি কিডনি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চুয়াডাঙ্গার নাজমা খাতুন। এভাবেই সাংবাদিকদের নিকট কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন হাফিজুর ও নাজমা দম্পতি।
চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের পৌর কলেজপাড়ার একটি ছোট ভাড়া বাসায় মানবেতর জীবন কাটছে হাফিজুর রহমান (৪৫) ও নাজমা খাতুন দম্পতির। অভাব-অনটনের সংসারে কোনো রকমে চলছিল জীবন। কিন্তু হঠাৎ অসুস্থতা যেন সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হাফিজুর রহমান ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থমকে গেছে পুরো পরিবার। চিকিৎসা ব্যয়, ঋণের চাপ আর দুই সন্তানকে নিয়ে এখন দিশেহারা স্ত্রী নাজমা খাতুন। শেষ পর্যন্ত স্বামীর চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনা বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
জানা গেছে, হাফিজুর রহমান পেশায় একজন ট্রাকচালক ছিলেন। প্রায় চার মাস আগে হঠাৎ ব্রেন স্ট্রোক করলে প্রথমে তাকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে এখন ঋণের বোঝায় জর্জরিত পরিবারটি।
এরই মধ্যে নতুন করে হাফিজুর রহমানের আলসার, প্রসাবে ইনফেকশন ও হৃদরোগ ধরা পড়েছে। বর্তমানে তিনি চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও অর্থাভাবে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছে পরিবারটি।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে স্ত্রী নাজমা খাতুন বাংলা এফএম বলেন, আমার স্বামীই ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা। ট্রাক চালিয়ে যা আয় করতেন, তা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চলতো। দুই ছেলে এখনো ছোট। হঠাৎ ব্রেন স্ট্রোক করার পর সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। প্রথমে পাড়া-প্রতিবেশী আর আত্মীয়স্বজন কিছুটা সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু এখন আর কেউ সাহায্য করতে পারছে না। প্রতিদিন হাসপাতালে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর খাবারের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমার দুই ছেলেই কুরআনের হাফেজ। বড় ছেলে নিশানের বয়স ১৯ বছর, ছোট ছেলে লিয়নের বয়স মাত্র ১৩ বছর। তারা এখনো পড়াশোনা করছে। কিন্তু সংসারে এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, কী করবো বুঝতে পারছি না। তাই বাধ্য হয়ে নিজের একটি কিডনি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যদি সেই টাকা দিয়ে স্বামীর চিকিৎসা করতে পারি, তাহলে অন্তত পরিবারটা বাঁচবে। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের কাছে আমি সাহায্যের আবেদন জানাই। কেউ যদি আমাদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে হয়তো আমার কিডনি বিক্রি করতে হবে না।
অসুস্থ হাফিজুর রহমান বলেন, আমি কোনোদিন ভাবিনি এমন দিন দেখতে হবে। আমি কাজ করে সংসার চালিয়েছি, কারো কাছে হাত পাতিনি। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর সবকিছু বদলে গেছে। এখন নিজের চিকিৎসার খরচই চালাতে পারছি না। স্ত্রীর কিডনি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। উপায়ও তো নেই। ইতোমধ্যে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ হয়ে গেছে। কিভাবে সেই টাকা শোধ করবো জানি না।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তিথিমিত্র বলেন, পরিবারটি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র ও ডকুমেন্টসসহ সমাজসেবা অফিসে আবেদন করলে সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া তারা সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

