পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি আবারও যুদ্ধের কালো মেঘে ঢাকা পড়ছে। একদিকে যখন পাকিস্তানের মাটিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তখনই ওমান সাগরে ইরানি কার্গো জাহাজ ‘তুসকা’ আটকের ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বভাবজাত ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা চরম চাপ প্রয়োগের নীতি এবার কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একটি রণতরীর সমান বিশালকার এই বাণিজ্যিক জাহাজটিকে ইঞ্জিন রুমে গোলাবর্ষণ করে অচল করা এবং পরবর্তীতে মেরিন সেনা পাঠিয়ে দখল করে নেওয়া কেবল একটি জাহাজ আটকের ঘটনা নয়, বরং এটি একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার নামান্তর। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী এটি ‘নৌ-অবরোধ’ রক্ষা হলেও ইরানের কাছে এটি স্পষ্টত ‘সশস্ত্র জলদস্যুতা’।
মজার বিষয় হলো, একদিকে হোয়াইট হাউস আলোচনার টেবিলে বসার ডাক দিচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্রসীমায় যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে আলোচনার পরিবেশকেই বিষাক্ত করে তুলছে। কূটনৈতিক ইতিহাসে এমন নজির বিরল যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষের গলা টিপে ধরে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। ‘ইউএসএস স্প্রুয়েন্স’ থেকে ছোঁড়া গোলা কেবল তুসকার ইঞ্জিন রুমকে ফুটো করেনি, বরং তা দুই দেশের মধ্যকার বিশ্বাসের ন্যূনতম ভিত্তিকেও ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
ইরান খুব পরিষ্কারভাবেই জানিয়ে দিয়েছে যে, এমন বৈরী পরিবেশে এবং নৌ-অবরোধ বহাল রেখে তারা পাকিস্তানে হতে যাওয়া দ্বিতীয় দফার আলোচনায় অংশ নেবে না। তেহরানের এই অনড় অবস্থান অত্যন্ত যৌক্তিক; কারণ কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রই তার ঘাড়ে বন্দুক রেখে করা শর্ত মেনে নিতে পারে না। মার্কিন প্রশাসন সম্ভবত ভুলে গেছে যে, কূটনীতিতে আস্থার জায়গাটি একবার নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধারে বছরের পর বছর সময় লাগে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই শান্তি চায়, নাকি আলোচনার আড়ালে ইরানকে আরও কোণঠাসা করার নীল নকশা তৈরি করছে? ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল, তা রক্ষা করার প্রাথমিক দায়বদ্ধতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। কিন্তু ট্রাম্পের ‘নৌ-অবরোধ’ বজায় রাখার একগুঁয়েমি এবং মাঝসমুদ্রে পণ্যবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন আসলে শক্তির ভাষায় কথা বলতেই বেশি আগ্রহী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে ধরণের ‘অযৌক্তিক’ শর্তারোপ করছে, তা কোনো সফল সংলাপের পথ প্রশস্ত করে না বরং সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করে। ইরানের শীর্ষ সামরিক সদর দপ্তর ‘খাতামুল আম্বিয়া’র পাল্টা হামলার হুমকি কেবল মৌখিক হুঁশিয়ারি নাও হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তুসকা জাহাজটি এখন কেবল একটি জব্দ করা জলযান নয়, বরং এটি একটি সম্ভাব্য বৃহত্তর যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন যদি মনে করে থাকে যে এভাবে জাহাজ আটকে ইরানকে আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করানো যাবে, তবে তারা সম্ভবত ইতিহাসের শিক্ষা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। শান্তি যখন দরজার কড়া নাড়ছিল, তখন ট্রাম্পের এই ‘তুসকা নীতি’ সেই দরজায় খিল এঁটে দিল।

