অ আ আবীর আকাশ, লক্ষ্মীপুর:
টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণ ও মেঘনা নদীর তীব্র জোয়ারে লক্ষ্মীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলা শহরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে সড়ক, বসতঘর, মাছের ঘের, সবজিক্ষেত ও আমনের বীজতলা। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক ও মৎস্যচাষিরা।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন লক্ষ্মীপুর সদরের চররমনী মোহনের বুড়ির ঘাট, জনতা বাজার, ভূঁইয়ার হাট, করাতির হাট, দালাল বাজারের সাবদী মাঝির খাল পাড় এলাকা,রায়পুরের মিয়ারহাট, চৈয়ালবাজার,মোল্লারহাট, কমলনগরের মতিরহাট,সাবের হাট, নাসির নগর, বাতির খাল, লুধুয়া, মাতাব্বর হাটসহ আলেকজান্ডার পৌর শহরের বাসিন্দারা । এদিকে টানা বৃষ্টিতে লক্ষ্মীপুর শহরের কলেজ রোড, জুবলী দিঘীর পাড়, সুলতান কমিশনার সড়ক, মিয়া আবু তাহের সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হাঁটুসমান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অনেক এলাকায় ড্রেন না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারেনি। ফলে নোংরা নর্দমার পানি রাস্তায় জমে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের মধ্যে চলাচল করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরসভার কিছু ওয়ার্ডে ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় এখনো কার্যকর ড্রেন নির্মাণ করা হয়নি। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন সড়ক পানির নিচে চলে যায়। বছরের পর বছর একই সমস্যার মুখোমুখি হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, “পৌরসভার বাসিন্দা হয়েও গ্রামের মতো জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই হাঁটুসমান পানির মধ্যে চলাচল করতে হয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তির শেষ নেই। আমরা এই সমস্যা থেকে স্থায়ী পরিত্রাণ চাই।”
এটিভিলাইভ.নিউজ রিপোর্টার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, নির্বাচনের সময় উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়, অথচ এ বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায় না।
এদিকে টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে জেলার উপকূলীয় সদর উপজেলার চর রমনী মোহন ইউনিয়ন, কমলনগর, রামগতি ও রায়পুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রবিবার রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, পানিতে তলিয়ে গেছে সবজিক্ষেত, আমনের বীজতলা এবং বিভিন্ন কৃষিজমি। এছাড়া অনেক মাছের ঘের ও জলাশয় পানিতে ভেসে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষক ও মৎস্যচাষিরা বলছেন, বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি দ্রুত না কমলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
রামগতি ও কমলনগর উপজেলার মেঘনাতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান, পর্যাপ্ত ও টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতিটি বড় জোয়ারেই নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এর ফলে প্রতিবছর নদীভাঙন, বসতবাড়ির ক্ষতি, ফসলহানি এবং মাছের ঘের ভেসে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
উপকূলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্যোগের সময় অনেক জনপ্রতিনিধিকে এলাকায় দেখা যায় না। পানিবন্দি মানুষের খোঁজ নেওয়া কিংবা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও পর্যাপ্ত নয়। তারা দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবি জানিয়েছেন।
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাহিদ-উজ-জামান জানান, সোমবার জেলায় ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিন মেঘনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। বৃষ্টি কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নদীভাঙন রোধ ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাসান বলেন, “টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে জেলার উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন স্থান প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা হবে।”
আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে জোয়ারের পানি আরও প্রায় ৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে লক্ষ্মীপুরের আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

