এম. আব্দুল কাইয়ুম

পহেলা বৈশাখ—বাংলা নববর্ষ—শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক, সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন এবং সাম্যের এক উজ্জ্বল আহ্বান। নতুন বছরের সূচনায় মানুষ যখন পুরনো সব গ্লানি ভুলে নতুন আশায় বুক বাঁধে, তখন “প্রত্যাশা” শব্দটি হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রত্যাশা শুধু ব্যক্তিগত সুখ-সমৃদ্ধির নয়; এটি একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং সংস্কৃতিসমৃদ্ধ সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা।
বাঙালিরা বৈশাখের প্রথম দিনকে উৎসবমূখর পরিবেশে বরণ করে নেয়। এটি বাঙালির চিরাচরিত একটি প্রথা। বৈশাখ আসে তার আপন গতিতে। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়সহ প্রকৃতিতে অন্যরকম পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। গাছে গাছে ফুল-ফলের মুকুল দেখা যায়।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানান রকমের বৈশাখী মেলা বসে। বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী সংগঠন দিবসটি উদযাপনের জন্য নানান আয়োজনের মধ্যে মঙ্গলশোভাযাত্রা, রমনা বটমূল ও ছায়ানটে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বেতার-টেলিভিশন ও পত্রিকায় বিভিন্ন ধরনের বৈশাখী রঙের আয়োজন থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। এখানে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে মানুষ একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনও অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার প্রাপ্তি, নিরাপত্তা—এসব ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা যায়। বিশেষ করে সামাজিক সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত ঘটনা এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা মানবাধিকারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বৈশাখ আমাদেরকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয় যে, নতুন বছর আসছে! জীবনের একটি বছর পার করে নতুন আরেকটি বছরে পদার্পন করতে। এই বার্তা দেয় পুরাতন ভুল-ভ্রান্তি, গ্লানি মুচে ফেলে নতুন করে শুরু করার জন্য। আমরা কি তা বুঝি? আমরা কি পুরাতন ত্রুটি সব ভুলে গিয়ে নতুন উদ্দিপনায়, নতুন আনন্দে, নতুন সহসায় জীবনকে গতিময় করতে পারবো?
বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতিও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট, বর্ণবৈষম্য, ধর্মীয় নিপীড়ন—এসব সমস্যা আজও মানবতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশগুলোতেও অভিবাসী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং তথ্যের নিরাপত্তাও মানবাধিকারের নতুন ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, সংস্কৃতি আজ বিশ্বায়নের চাপে নানা পরিবর্তনের মুখোমুখি। আধুনিকতা ও প্রযুক্তি যেমন সংস্কৃতিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে, তেমনি অনেক সময় স্থানীয় সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি করছে। বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবগুলো আমাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে বাণিজ্যিকীকরণ ও বাহ্যিক চাকচিক্যের কারণে কখনো কখনো এর মূল চেতনা আড়াল হয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রত্যাশা হওয়া উচিত—মানবাধিকার ও সংস্কৃতির মধ্যে একটি সুসমন্বিত সম্পর্ক গড়ে তোলা। একটি সমাজ তখনই উন্নত হতে পারে, যখন সেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয় এবং সংস্কৃতি স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। পহেলা বৈশাখ আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়—সাম্য, সৌহার্দ্য এবং মানবতার।
নতুন বছরের এই প্রভাতে আমাদের অঙ্গীকার হোক—
মানুষের অধিকার রক্ষা করবো,
সংস্কৃতিকে লালন করবো,
এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলবো।
পহেলা বৈশাখ শুধু নতুন বছর নয়, এটি নতুন চিন্তার সূচনা। আমাদের প্রত্যাশা—একটি পৃথিবী, যেখানে মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং সংস্কৃতি হবে মানুষের মুক্ত প্রকাশের মাধ্যম। এই প্রত্যাশাই হোক আমাদের আগামীর পথচলার শক্তি।
“মানুষ-মানুষের জন্য, সুন্দর এই পৃথিবী সবার জন্য, আর সবার অধিকার সমান!”
শুভ নববর্ষ-১৪৩৩
এম. আব্দুল কাইয়ুম
মানবাধিকারকর্মী

