২০২৬ সালের মে মাস। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এক নতুন ও ভয়ংকর মোড় নিয়েছে ইতিহাস। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী দম্ভ, অন্যদিকে ইরানের আধ্যাত্মিক নেতা মুজতাবা খামেনির সুদূরপ্রসারী কৌশল। দুই মেরুর এই লড়াইয়ে বিশ্ব আজ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে।
বুমবার্গের ব্রেকিং নিউজ অনুযায়ী, আমেরিকা প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে হাইপারসনিক মিসাইল মোতায়েন করেছে। পেন্টাগনের এই পদক্ষেপকে স্কাই নিউজ দেখছে ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করার একটি ‘স্বল্পমেয়াদী কিন্তু শক্তিশালী’ হামলার পরিকল্পনা হিসেবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব কি আসলেই কাজ করছে? সিএনএন-এর রিপোর্ট বলছে, সেন্টকম আজ ট্রাম্পকে পরবর্তী হামলার ব্রিফিং দেবে।
অথচ খোদ আমেরিকার অন্দরেই শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। মার্কিন কংগ্রেসে ডিফেন্স সেক্রেটারি পিট হেগসেথকে যখন প্রশ্ন করা হলো—এই ৪০ দিনের যুদ্ধে কত খরচ হয়েছে? উত্তর এলো ২৫ বিলিয়ন ডলার। যা বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের এক বছরের জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি! এই বিপুল অর্থ ব্যয় আর নিরপরাধ শিশুদের রক্ত নিয়ে খেলার হিসাব হেগসেথের কাছে নেই, নেই সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের পাম্পে গিয়ে চড়া দামে তেল কেনার ভোগান্তির সমাধানও।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন নিজ দলের মধ্যেই ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। তবুও তার সাম্রাজ্যবাদী নেশা কাটছে না। হরমুজ প্রণালীর ছবি দিয়ে তিনি ক্যাপশন দিচ্ছেন ‘Strait of Trump’। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধ্যাপক রবার্ট পেপ যেমনটা বলেছেন—এই সপ্তাহেই আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে তার দীর্ঘদিনের ‘হেজেমনি’ বা প্রভাব হারিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন পাকিস্তান, ওমান, রাশিয়া, সৌদি আরব ও কাতার সফর করে আঞ্চলিক ঐক্য গড়ছেন, সেখানে আমেরিকা ব্রাত্য। এমনকি আমেরিকার মিত্র জার্মানির চ্যান্সেলরও বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, আমেরিকা আজ ইরানি নেতৃত্বের কাছে অপমানিত হচ্ছে। পাল্টাপাল্টি মন্তব্যে ব্রিটিশ রাজা চার্লসও মনে করিয়ে দিয়েছেন ইতিহাসের পুরনো হিসাব। ট্রাম্প যখন বলছেন আমেরিকা না থাকলে ইউরোপ জার্মান ভাষায় কথা বলত, তখন ব্রিটিশ রাজার পাল্টা খোঁচা—ব্রিটিশরা না থাকলে মার্কিনিরা ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলত। অর্থাৎ, আমেরিকার কোনো অযৌক্তিক দম্ভ এখন আর কেউ মুখ বুজে সইছে না।
ইরানের নেতা মুজতাবা খামেনির আজকের বার্তাটি এই নতুন পরিস্থিতির জলজ্যান্ত প্রতিফলন। তিনি যখন বলেন, “পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর জন্য একটি নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে,” তখন সেটি কেবল একটি স্লোগান নয়। পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে সড়কপথ উন্মুক্ত হওয়া এবং তেল-গ্যাস রপ্তানির বিকল্প রুট তৈরি হওয়া প্রমাণ করে যে, আমেরিকার অবরোধ এখন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ওপেক’ ত্যাগ এবং পাকিস্তানের সামরিক চুক্তির পরিবর্তনগুলো নির্দেশ করছে—ইরান একটি নতুন আঞ্চলিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পেপ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “একটি পারমাণবিক ইরান এখন অনিবার্য।” ট্রাম্প এবং হেগসেথের কূটনৈতিক জ্ঞানহীনতা আমেরিকাকে একঘরে করে ফেলছে। যুদ্ধের নামে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা সাগরের পানিতে ঢাললেও সাফল্য শূন্য। বরং ইরান বুঝিয়ে দিচ্ছে, এই সংকটময় মুহূর্তেও তারা বুদ্ধিমান ও কুশলী।
আজকের সেন্টকম ব্রিফিং-এর পর ট্রাম্প যদি আবার ইরানে হামলার ভুল সিদ্ধান্ত নেন, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রই পাল্টাবে না, বরং ২০২৬ সাল হবে বিশ্বমঞ্চে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত পতনের বছর। ইতিহাসের পাতায় ট্রাম্প হয়ত একজন ‘ম্যানিয়াক’ হিসেবেই চিহ্নিত হবেন, যিনি তার দাম্ভিকতায় খোদ আমেরিকাকেই ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি সাক্ষী থাকবে এক নতুন নেতৃত্বের, যেখানে বহিঃশক্তির খবরদারি নয়, বরং আঞ্চলিক ঐক্যই হবে শেষ কথা।

