লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
সভ্যতার অগ্রযাত্রায় নারী শুধু একটি অংশ নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। একজন নারীই মা, বোন, কন্যা কিংবা সহধর্মিণীর পরিচয়ে পরিবারকে আগলে রাখেন এবং সমাজকে মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করেন। তাই মাতৃজাতির মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি জাতির উন্নয়ন ও সভ্যতার মানদণ্ড। যে সমাজে নারীর সম্মান রক্ষা হয়, সে সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত ও মানবিক সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে নারীর অবদান অত্যন্ত গৌরবময়। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, শিল্প, সাহিত্য, ক্রীড়া কিংবা প্রযুক্তি, সর্বত্র নারীর সফল পদচারণা দৃশ্যমান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই অগ্রগতির পাশাপাশি নারীরা এখনও নানা ধরনের বৈষম্য, সহিংসতা ও অনিরাপত্তার শিকার হচ্ছেন।
নারীর প্রতি সহিংসতা একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ধর্ষণ, যৌতুক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, পারিবারিক সহিংসতা ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানির মতো ঘটনা সমাজের বিবেককে প্রতিনিয়ত আহত করছে। প্রযুক্তির এই যুগে সাইবার বুলিং ও অনলাইন হয়রানিও নারীদের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ঘটনা শুধু একজন নারীকে নয়, পুরো সমাজকে কলঙ্কিত করে। কারণ নারীর নিরাপত্তাহীনতা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ অনিরাপদ হয়ে পড়া।
নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হয়। যদি পরিবারে নারীকে সম্মান করার শিক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। একজন ছেলে শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে, নারী কোনো ভোগের বস্তু নয়, বরং সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। একইসঙ্গে মেয়েশিশুকেও আত্মসম্মান ও আত্মরক্ষার শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সমাজে চলতে পারে।
শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। শিক্ষিত নারী শুধু নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন না, বরং পরিবার ও সমাজকেও আলোকিত করেন। তাই নারীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও অনেক পরিবার মেয়েদের উচ্চশিক্ষাকে গুরুত্ব দেয় না। বাল্যবিবাহ ও দারিদ্র্যের কারণে অনেক মেয়ে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ে। এ অবস্থা পরিবর্তনে সরকার, সামাজিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনের কঠোর প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, প্রভাবশালী মহলের কারণে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়, যা ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং বিচার ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করতে হবে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ইতিবাচক সচেতনতা সৃষ্টি, নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মিডিয়ার দায়িত্ব অনেক। তবে একইসঙ্গে কিছু গণমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীর প্রতি নেতিবাচক ও অশালীন উপস্থাপনাও বন্ধ করতে হবে। কারণ সংস্কৃতি ও মিডিয়া মানুষের মানসিকতা গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাও নারীর মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিটি ধর্মেই নারীকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত বলা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নারীদের প্রতি সদাচরণ ও সম্মানের শিক্ষা দিয়েছেন। অথচ কিছু মানুষ ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করে, যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধ মানুষকে মানবিক ও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।
কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি। বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে নারীরা বিশাল অবদান রাখছেন। তৈরি পোশাক শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা এখনও অনেক নারীর জন্য বড় সমস্যা। তাই নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ, সমান সুযোগ ও নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলনও অত্যন্ত প্রয়োজন। কেবল প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। একজন নারী যখন নির্যাতনের শিকার হন, তখন শুধু তার পরিবার নয়, পুরো সমাজের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো। সামাজিক লজ্জা ও কুসংস্কারের কারণে অনেক নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করতে ভয় পান। এই ভয় ও সংকোচ দূর করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে নারী উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতেই হবে। কারণ নিরাপত্তাহীন নারী কখনোই পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারেন না।
একটি সভ্য জাতির পরিচয় তার নারীদের অবস্থানের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। তাই মাতৃজাতির মর্যাদা রক্ষা করা মানে মানবতার মর্যাদা রক্ষা করা। নারীকে সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব নিজ নিজ অবস্থান থেকে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করা। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং প্রতিটি নাগরিক একসঙ্গে এগিয়ে এলে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যমুক্ত একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
মায়েদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ বছর ৮ মে (রবিবার) বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে মা দিবস নানা আয়োজনে পালন করা হচ্ছে। মায়েদের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়া ও তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা এই দিবসের মূখ্য উদ্দেশ্য হলেও এর তাৎপর্য আরও অনেক ব্যাপক। সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার অগ্রযাত্রায় মায়েদের অক্লান্ত শ্রম, ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতি দিতেই এ দিবস তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্প্রতি নারী ও কন্যাশিশুর ওপর সহিংসতা, নির্যাতন ও অনিরাপত্তার ঘটনা আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন তার জন্য ঘরে ও বাইরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ক্ষমতায়নের কথা বলা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদিও বিশ্ব রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি বারবার উচ্চারিত হয়। কিন্তু তাকে ক্ষমতায়িত করার জন্য যে নিরাপদ ও সহায়ক সামাজিক পরিবেশ প্রয়োজন, সমাজের বাস্তবতায় তার যথেষ্ট ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
মাতৃজাতির মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়, এটি নিশ্চিত করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। নারীকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই সমাজে সত্যিকারের সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। আসুন, আমরা সবাই নারীকে মর্যাদা দিই, নিরাপত্তা নিশ্চিত করি এবং একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও সুন্দর সমাজ গঠনে ঐক্যবদ্ধ হই।
সকল ধর্মেই মাতৃজাতির তথা নারীদের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মে নারীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করা হয়েছে। মাতৃজাতির মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নারীদের এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীল ব্যক্তিসহ সবার সদিচ্ছা ও কার্যকর ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি

