নাজমুল হোসেন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী আশির উদ্দিন। তাকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখলে সহজে কেউ বুঝতেই পারবে না, তিনি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। তার দুই পা সম্পূর্ণ অকেজো। তবুও সৃষ্টিকর্তার প্রতি তার নেই কোনো অভিযোগ।
দৃঢ় মনোবল ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন সফল মানুষ হিসেবে।
চেহারা, গঠন কিংবা উপস্থিতি—কোনো দিক থেকেই তাকে সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা মনে হয় না। বরং মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষকে থামিয়ে রাখতে পারে না।
দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে না পারলেও আশির উদ্দিন নিজের মতো করেই চলাফেরা করেন। প্রয়োজন হলে দুই হাত ও বিশেষ জুতার সাহায্যে চলেন।

আগে দূরে কোথাও যেতে হলে অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হতো। তবে ব্যাটারিচালিত অটোগাড়ি চালুর পর থেকে এখন অনেকটাই স্বনির্ভর হয়ে উঠেছেন তিনি।
এক সময় জীবিকার তাগিদে পুরোনো তিন চাকার ব্যাটারিচালিত ভ্যান ব্যবহার করতেন। বর্তমানে কম দামের একটি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। তবে সেটি প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায়, যা তাকে ভোগান্তিতে ফেলে। বিশেষ করে এমন অবস্থায় তিনি নিজে থেকে গাড়িটি সরাতে না পারায় অন্যের সহায়তা নিতে হয়।
সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রতিদিন অসংখ্য সাধারণ মানুষের অনলাইনভিত্তিক সেবা প্রদান করেন তিনি। এর বিনিময়ে সরকারি কোনো নির্দিষ্ট ভাতা পান না। মানুষ কাজের সন্তুষ্টি থেকে যে সম্মানী দেন, তা দিয়েই চলে তার সংসার।
নিজের এই আয় দিয়েই তিনি স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জীবনযাপন করছেন। সীমাবদ্ধতাকে জয় করে আশির উদ্দিন আজ এলাকার অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার নাম।
আশির উদ্দিন ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ৩ নম্বর হোসেনগাঁও ইউনিয়নের কলিগাঁও গ্রামের মো. মাতিন ও সাজিরুন দম্পতির ৬ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান।
আশির উদ্দিন বলেন, “আমি হোসেনগাঁও ইউনিয়নের মুন্সি আব্দুল জব্বার দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হই। পরে পাশ্ববর্তী হরিপুর উপজেলার কাঠালডাঙ্গীর একটি কৃষি ডিপ্লোমা কলেজে ভর্তি হই এবং সেখান থেকে ডিপ্লোমা পাস করি।
ছাত্রাবস্থায় পড়াশোনার খরচ যোগাতে টিউশনি করাতাম, পাশাপাশি কম্পিউটারের প্রশিক্ষণ নিতাম। এরপর থেকেই দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই ইউনিয়ন পরিষদে উদ্যোক্তা হিসেবে অনলাইনের মাধ্যমে মানুষের সেবা করে আসছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি একজন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী মানুষ। ছোট থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম। নিজেকে এ পর্যন্ত নিয়ে আসতে আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমার মতো অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু আমি ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত না হয়ে বরং অনেক ভিক্ষুককে সাহায্য করার সক্ষমতা অর্জন করেছি। কারণ আমি জানি, ভিক্ষাবৃত্তি সমাজের জন্য ভালো কিছু নয়।
তাই পড়াশোনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছি। আল্লাহ সহায় থাকলে ভবিষ্যতে আরও ভালো জায়গায় যেতে পারব।” তিনি বলেন, “সরকারের কাছে আমার একটি অনুরোধ, আমার জন্য যদি কোনো সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে পরিবার নিয়ে আরও ভালোভাবে চলতে পারব। বর্তমানে স্ত্রী, দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়।”
হোসেনগাঁও ইউনিয়নে সেবা নিতে আসা মো. লিটন, রফিকুল ইসলাম, লিমা আক্তার ও খাদেমুল ইসলামসহ অনেকেই তার প্রশংসা করে বলেন, আশির উদ্দিন একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও সমাজের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার মতো অনেকেই সমাজে ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিলেও তিনি পড়াশোনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়নের বাসিন্দাদের বিভিন্ন অনলাইন সেবা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে দিয়ে সহায়তা করছেন। এতে এলাকাবাসী উপকৃত হচ্ছেন। বিনিময়ে মানুষ তাকে যে সম্মানী দেন, তা নিয়েই তিনি সন্তুষ্ট থাকেন। এছাড়া তিনি অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র স্বভাবের মানুষ। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার কারণে এলাকায় তিনি একজন অনুকরণীয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, আশির উদ্দিন খুব ভদ্র ও ভালো মানুষ। তিনি আমাদের অফিস থেকে নিয়মিত প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়ে থাকেন। এছাড়া সমাজসেবা অফিস থেকে ঋণ গ্রহণ করে সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। কয়েক বছর আগে আমরা তাকে শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা হিসেবে পুরস্কৃত করেছি।
সংশ্লিষ্ট হোসেনগাঁও ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান হেদায়েতুল্লাহ বলেন, “আশির উদ্দিন একজন ভালো মনের মানুষ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও তিনি হোসেনগাঁও ইউনিয়নের মানুষের সেবা দিয়ে নিজেকে সফল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

