সত্যজিৎ দাস:
জনবল সংকট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা হলেও চিকিৎসাসেবা,প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে ইতিবাচক অগ্রগতি ধরে রেখেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। মে ২০২৬ মাসের কর্মসম্পাদন প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা,মানবসম্পদ পরিস্থিতি ও হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের চিত্র উঠে এসেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য প্রোফাইল অনুযায়ী,শ্রীমঙ্গলের স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কে বর্তমানে মোট ৪৮টি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স,৩১টি কমিউনিটি ক্লিনিক,৭টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র,২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র, একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং ৬টি এনজিও হাসপাতাল বা ক্লিনিক।
প্রশাসনিক সক্ষমতার মূল্যায়নেও শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ (এইচএসএস) স্কোরিংয়ে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ৮৪ দশমিক ৯২ নম্বর পেয়ে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় পর্যায়ে ১১তম স্থান অর্জন করে।
তবে অগ্রগতির এই পথ সহজ নয়। মানবসম্পদ সংকট এখনও স্বাস্থ্যসেবার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১৬৮টি অনুমোদিত পদের মধ্যে বর্তমানে পূরণ রয়েছে ১২১টি,শূন্য রয়েছে ৪৭টি পদ। এতে সামগ্রিক শূন্যতার হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশে।
সবচেয়ে বেশি সংকট চিকিৎসক পদে। ৩৩টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৪ জন। ফলে এ বিভাগে শূন্যতার হার ৫৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বিভাগেও রয়েছে অর্ধেক জনবলের ঘাটতি। তবে নার্সিং বিভাগে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। ৩২টি পদের মধ্যে ২৯টি পূরণ থাকায় এ বিভাগে শূন্যতার হার মাত্র ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ডেন্টাল সার্জন ও এএমসি হোমিওপ্যাথি বিভাগে কোনো পদ শূন্য নেই।
জনবল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চিকিৎসা কার্যক্রমে সক্রিয়তা ধরে রেখেছে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। মে মাসে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে মোট ৭২৪টি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৭১৭টি ছিল মাইনর সার্জারি এবং ৭টি মেজর অপারেশন।
বিশেষ নবজাতক পরিচর্যা ইউনিট (স্ক্যানু) নিয়মিত সেবা দিয়ে যাচ্ছে। মে মাসে এ ইউনিটে সাতজন নবজাতক চিকিৎসাসেবা পেয়েছে, যাদের মধ্যে একজন ছেলে ও ছয়জন মেয়ে শিশু রয়েছে।
অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনাতেও রোগীর চাপ ছিল উল্লেখযোগ্য। হাসপাতালের এনসিডি কর্নারে এক মাসে মোট ২ হাজার ৩৪ জন রোগী সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিলেন ১ হাজার ৭৬০ জন এবং ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল ২৭৪ জন।
জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতেও উজ্জ্বল সাফল্য দেখিয়েছে মৌলভীবাজার জেলা। হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান অভিযানে সিলেট বিভাগে ১৩ লাখ ২৩ হাজার ৬২৯ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর বিপরীতে টিকা পেয়েছে ১৩ লাখ ২ হাজার ৯ জন শিশু,যা ৯৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ কভারেজ।
এ অভিযানে মৌলভীবাজার ছিল বিভাগের অন্যতম সেরা পারফরমার। জেলার ২ লাখ ৪ হাজার ৯৮৬ জন শিশুর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪১ জন স্কুল ও কমিউনিটির শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। ফলে জেলার কভারেজ দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৬৪ শতাংশে। সিলেট সিটি করপোরেশনের পরই অবস্থান করে মৌলভীবাজার, যা সুনামগঞ্জ,হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন,“জনবল সংকট আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলেও সেবার মান ধরে রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। চিকিৎসাসেবা ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এমআর টিকাদানে জেলার এ সাফল্য স্বাস্থ্যকর্মী,শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের ফল।”
মে ২০২৬ মাসের প্রতিবেদন বলছে,সীমিত জনবল নিয়েই স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য সূচকে ধারাবাহিক অগ্রগতি ধরে রেখে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মৌলভীবাজারের স্বাস্থ্যখাতে এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।

