এম আব্দুল কাইয়ুম
সাহিত্যিক ও মানবাধিকারকর্মী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক মহিমান্বিত দিন। ২৫শে বৈশাখে জন্ম নেওয়া এই বিশ্বকবি শুধু বাংলা ভাষাকেই নয়, পুরো বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর জীবনকে ঘিরে রয়েছে বহু বিরল, বিস্ময়কর ও কম-জানা ঘটনা, যা আজও মানুষকে মুগ্ধ করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে কিছু বিরল ও বিস্ময়কর ঘটনা
১. তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেলজয়ী
১৯১৩ সালে তাঁর কাব্যগ্রন্থ Gitanjali-এর জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। এটি ছিল এশিয়ার প্রথম নোবেল পুরস্কারও। তাঁর ইংরেজি অনুবাদ পড়ে ইউরোপের সাহিত্যজগৎ বিস্মিত হয়ে যায়।
২. দুই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা
বিশ্বে খুব কম কবির এমন সৌভাগ্য হয়েছে।
Bangladesh-এর জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা”
India-এর জাতীয় সংগীত “জন গণ মন”
— উভয়ই রবীন্দ্রনাথের লেখা।
এছাড়া Sri Lanka-এর জাতীয় সংগীতের সুরেও তাঁর প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়।
৩. ছোটবেলায় তিনি স্কুল অপছন্দ করতেন
রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত বিদ্যালয়ের কঠোর নিয়ম পছন্দ করতেন না। তাই তিনি খুব বেশি স্কুলে যাননি। পরে নিজের শিক্ষাদর্শে প্রতিষ্ঠা করেন Visva-Bharati University, যেখানে প্রকৃতির মাঝে মুক্ত শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।
৪. ব্রিটিশদের ‘নাইট’ উপাধি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন
১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে “নাইটহুড” উপাধি দেয়। কিন্তু ১৯১৯ সালের Jallianwala Bagh Massacre-এর প্রতিবাদে তিনি সেই সম্মান ফিরিয়ে দেন। এটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রতিবাদ।
৫. তিনি একাধারে কবি, সুরকার, চিত্রশিল্পী ও দার্শনিক
অনেকেই জানেন না, জীবনের শেষদিকে তিনি ছবি আঁকায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। তাঁর আঁকা চিত্রকর্ম ইউরোপেও প্রদর্শিত হয়েছিল। তিনি প্রায় ২,০০০-এর বেশি গান রচনা করেন, যা আজ “রবীন্দ্রসংগীত” নামে অমর।
৬. আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক আলাপ
Albert Einstein ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিজ্ঞান, সত্য ও মানবতা নিয়ে এক ঐতিহাসিক আলোচনা হয়েছিল ১৯৩০ সালে। সেই আলাপ আজও বিশ্ববুদ্ধিজীবীদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
৭. তাঁর লেখা গান স্বাধীনতা আন্দোলনে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর গান ও কবিতা বিপ্লবীদের মনে সাহস জুগিয়েছিল। “একলা চলো রে” গানটি আজও সংগ্রাম ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
৮. রবীন্দ্রনাথের হাতে লেখা নোবেল পদক একবার চুরি হয়েছিল
Rabindra Bharati Museum থেকে তাঁর নোবেল পদক ২০০৪ সালে চুরি হয়ে যায়। পরে তার প্রতিলিপি তৈরি করা হয়।
৯. তিনি পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছিলেন
জাপান, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, চীনসহ বহু দেশে তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন। বিশ্বশান্তি, মানবতা ও শিক্ষার বার্তা ছড়িয়েছেন সর্বত্র।
১০. মৃত্যুর আগমুহূর্তেও তিনি লিখে গেছেন
জীবনের শেষ সময়েও তাঁর সৃষ্টিশীলতা থামেনি। অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি কবিতা লিখেছেন। তাঁর শেষ দিকের কবিতাগুলোতে জীবন, মৃত্যু ও মহাবিশ্ব নিয়ে গভীর দর্শন প্রকাশ পেয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের তাৎপর্য
২৫শে বৈশাখ শুধু একজন কবির জন্মদিন নয়; এটি বাংলা সংস্কৃতির আত্মপরিচয়ের দিন। তাঁর সাহিত্য, গান, দর্শন ও মানবতাবাদ আজও বিশ্বকে আলোকিত করে চলেছে।
স্মরণীয় উক্তি
> “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।”
> “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন শুধু একজন কবি নন; তিনি ছিলেন এক চলমান সভ্যতা, এক অনন্ত আলোর নাম।

