সত্যজিৎ দাস:
বাংলাদেশের লোকসংগীতকে সমকালীন শিল্পভাষায় নতুনভাবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে যে ক’জন শিল্পীর নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়, তাঁদের অন্যতম রাহুল আনন্দ। সংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, বাদ্যযন্ত্রী, নাট্যকর্মী, চিত্রশিল্পী এবং বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা হিসেবে তিনি নিজস্ব এক স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন।
জনপ্রিয় ব্যান্ড জলের গান-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলার লোকঐতিহ্য, প্রকৃতি, মানুষের জীবনবোধ ও সংস্কৃতিকে গানে, সুরে এবং অভিনব বাদ্যযন্ত্রে তুলে ধরছেন। গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) তাঁর ৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক এক সংগ্রামী শিল্পীর জীবন, সৃষ্টির পথচলা এবং সময়ের নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর লড়াইয়ের গল্প।
হাওর থেকে শুরুঃ- ১৯৭৬ সালের ৩০ জুন হবিগঞ্জে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন রাহুল আনন্দ। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের কটারকোনা গ্রামে। শৈশবের প্রথম দিনগুলো কেটেছে হাওরের জল,নৌকা,মাঝিমাল্লার ভাটিয়ালি গান আর প্রকৃতির অপরূপ সান্নিধ্যে। এই জল-হাওয়ার দেশই তাঁর শিল্পীসত্তার ভিত গড়ে দেয়।
পরবর্তীতে পরিবারের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জে চলে যান। নাগরিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা যেমন তাঁর জীবনকে নতুনভাবে চিনিয়েছে, তেমনি গ্রামবাংলার স্মৃতিও কখনো তাঁকে ছেড়ে যায়নি। এই দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মিলনই পরবর্তীকালে তাঁর সংগীতে গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের এক অনন্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
সিলেটে শিল্পীসত্তার বিকাশঃ-কলেজজীবনে সিলেটে এসে তিনি যুক্ত হন ‘দর্পণ থিয়েটার’-এর সঙ্গে। সেখান থেকেই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যচর্চার সূচনা। একই সময়ে গড়ে ওঠে শিল্প,সংস্কৃতি ও লোকবাদ্যযন্ত্র নির্মাণের প্রতি গভীর অনুরাগ।
সিলেটের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তাঁর চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে নতুন মাত্রা দেয়। এখানেই তিনি উপলব্ধি করেন,বাংলার মাটি,মানুষ ও লোকসংস্কৃতিই হতে পারে তাঁর শিল্পচর্চার প্রধান অবলম্বন।
চারুকলা থেকে থিয়েটারঃ-পরবর্তীতে তিনি ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ভর্তি হন। পাশাপাশি যুক্ত হন দেশের অন্যতম নাট্যসংগঠন ‘আরণ্যক নাট্যদল’-এ। পরে সহশিল্পীদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘প্রাচ্যনাট’।থিয়েটারচর্চার মধ্য দিয়েই তাঁর পরিচয় ঘটে দেশের অসংখ্য সংগীতশিল্পীর সঙ্গে। ধীরে ধীরে নাটকের পাশাপাশি সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান সৃজনভুবন।
‘জলের গান’-এর জন্মঃ-২০০৬ সালে রাহুল আনন্দ ও তাঁর সহযাত্রীরা প্রতিষ্ঠা করেন ব্যান্ড জলের গান। লোকসংগীতকে নতুন আঙ্গিকে পরিবেশন, প্রকৃতির শব্দকে সংগীতে রূপ দেওয়া এবং নিজেদের হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ব্যান্ডটি খুব দ্রুতই শ্রোতাদের ভালোবাসা অর্জন করে।
রাহুল আনন্দ নিজে বাঁশি,ঢোল,দোতারা, হারমোনিয়ামসহ একাধিক বাদ্যযন্ত্রে সমান দক্ষ। তাঁর বিশেষ পরিচিতি এসেছে দেশীয় উপকরণ দিয়ে অভিনব বাদ্যযন্ত্র নির্মাণের জন্যও।‘রঙের গান’, ‘ও ঝরা পাতা’, ‘পাখির গান’, ‘বৃষ্টির গান’, ‘বকুল ফুল’, ‘বাউলা বাতাস’ ও ‘দূরে থাকা মেঘ’সহ তাঁর অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে সমানভাবে অনুরণিত হয়।
শেকড়ের প্রতি আজীবন টানঃ-মৌলভীবাজারের কটারকোনা গ্রামের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য,ছোটবেলা থেকেই গ্রামের নানা প্রজাতির বাঁশ হাতে পেলেই তিনি বাঁশি বানানোর চেষ্টা করতেন। লোকজ সংস্কৃতি, মাটির ঘ্রাণ আর গ্রামীণ জীবন তাঁর শিল্পীজীবনের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা।নিজের ইচ্ছার কথা বলতে গিয়ে তিনি একসময় বলেছিলেন,“মাটি দিয়ে ঘর বানিয়ে এখানে থাকব।”এই গ্রামীণ পরিবেশই পরবর্তীকালে তাঁর সংগীত ও বাদ্যযন্ত্র নির্মাণের দর্শনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
‘ভাঙা বাড়ি’ থেকে ‘আনন্দপুর’:-ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের একটি প্রায় ১৪০ বছরের পুরোনো একতলা ভিনটেজ বাড়িতে দীর্ঘ আট বছর পরিবার নিয়ে বসবাস করেন রাহুল আনন্দ। আদর করে তিনি বাড়িটির নাম দিয়েছিলেন ‘ভাঙা বাড়ি’। এটিই ছিল তাঁর বাসস্থান,‘জলের গান’-এর স্টুডিও এবং শিল্পচর্চার প্রাণকেন্দ্র ‘আনন্দপুর’।স্ত্রী ঊর্মিলা শুক্লা ও একমাত্র ছেলে তোতাকে নিয়ে এই বাড়িতেই গড়ে উঠেছিল তাঁর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মাক্রোঁর সফরে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের লোকসংগীতঃ-২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সফরে এসে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ গভীর রাতে রাহুল আনন্দের ধানমন্ডির বাসভবনে যান। প্রায় দেড় ঘণ্টার সেই আয়োজনে তিনি ‘জলের গান’-এর স্টুডিও ঘুরে দেখেন,বাদ্যযন্ত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন এবং বাংলাদেশের লোকসংগীত ও সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন।সেখানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী আশফিকা রহমান,কামরুজ্জামান স্বাধীন ও আফরোজা সারাও। বাংলাদেশের লোকঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই সফর ছিল এক অনন্য স্বীকৃতি।
২০২৪-এর অগ্নিকাণ্ড:স্বপ্নভাঙার বেদনাঃ-২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকার বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা,ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রাহুল আনন্দের ভাড়া বাসাও আগুনে পুড়ে যায়।আগুনে ধ্বংস হয়ে যায় তাঁর বহু বছরের শ্রমে তৈরি ও সংগ্রহ করা সহস্রাধিক বাদ্যযন্ত্র,স্টুডিও, শিল্পকর্ম এবং অমূল্য স্মৃতির ভাণ্ডার। পরিবারকে নিয়ে এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে।এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি সহশিল্পীদের নিয়ে রাজধানীর রবীন্দ্রসরোবরে অবস্থান করেছিলেন। হামলার আগে তিনি নিজেকে আন্দোলনের সমর্থক বলেও পরিচয় দেন। পরে তিনি ও তাঁর স্ত্রী স্পষ্ট করে জানান,ঘটনাটি কেবল তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে বা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়নি;ওই এলাকায় সংঘটিত বৃহত্তর সহিংসতার মধ্যেই তাঁদের বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।ঘটনার পর দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সংগীতশিল্পী অর্ণব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, “খাল কেটে কোন কুমির আনলাম আমরা?”
নতুন দেশে,নতুন সংগ্রামঃ-অগ্নিকাণ্ডের পর পরিবারসহ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন রাহুল আনন্দ। প্রবাসজীবনে নতুন করে বাদ্যযন্ত্র নির্মাণ ও সংগীতচর্চা শুরু করলেও হারিয়ে যাওয়া সৃষ্টিসম্ভারের বেদনা আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়।ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য,আগের মতো প্রাণচঞ্চল না থাকলেও শিল্পচর্চা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি তিনি। সবসময় তাঁর পাশে রয়েছেন জীবনসঙ্গিনী ঊর্মিলা শুক্লা।
একজন শিল্পীর উত্তরাধিকারঃ-রাহুল আনন্দ কখনো কেবল একজন গায়ক ছিলেন না। তিনি একজন সংস্কৃতিসাধক, লোকঐতিহ্যের অনুসন্ধানী,বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা এবং মানুষের শিল্পী।
হাওরের জল,কুলাউড়ার মাটি,নারায়ণগঞ্জের শহুরে জীবন,সিলেটের নাট্যচর্চা এবং ঢাকার শিল্পাঙ্গন মিলিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিচয়। তাঁর গান শুধু বিনোদন নয়,বরং বাংলার মাটি,প্রকৃতি,মানুষ এবং ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল।
অর্ধশতকে পদার্পণের এই সময়ে রাহুল আনন্দের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিল্প ধ্বংস করা যায়,কিন্তু শিল্পীর স্বপ্নকে নয়। মাটি,মানুষ আর সুরের প্রতি তাঁর নিবেদন আগামী প্রজন্মের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

