মো: এ কে নোমান, নওগাঁ প্রতিনিধি:
নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলের তিন জেলায় একের পর এক নারীদের ওপর গভীর রাতে নৃশংস হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত মোস্ট ওয়ান্টেড ‘সাইকো কিলার’ ও আন্তঃজেলা সিরিয়াল অপরাধী গোলাম মোর্শেদ ওরফে মোর্শেদ আলম (২৭)-কে গ্রেপ্তার করেছে নওগাঁ জেলা পুলিশ।
আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে গাজীপুরের বাসন থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃত মোর্শেদ দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার পাতহাট গ্রামের হইবর রহমান ওরফে হবিবরের ছেলে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে নওগাঁ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৭ থেকে ১৮ জন নারীর ওপর নৃশংস হামলার কথা স্বীকার করেছে। এসব ঘটনায় তিনজন নারী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মোর্শেদের অপরাধ সংঘটনের ধরন ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও সাইকোপ্যাথিক প্রকৃতির। গভীর রাত, বিশেষ করে রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে সে একা থাকা কিংবা নারীদের বসবাসকারী বাড়িগুলোকে টার্গেট করত। দেয়াল টপকে অথবা জানালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে ঘুমন্ত নারীদের মাথা ও কপালে টিউবওয়েলের হাতল, লোহার শাবল কিংবা বাঁশ দিয়ে সজোরে আঘাত করে দ্রুত পালিয়ে যেত। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্য থাকলেও নারীদের মাথায় গুরুতর আঘাত করাই ছিল তার অপরাধের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
তদন্তে জানা যায়, গত ১৮ জানুয়ারি ধামইরহাট উপজেলার নানাইচ ও জাহানপুর গ্রামে তিনটি বাড়িতে হামলা চালায় মোর্শেদ। এ সময় কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবাকে টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে মাথায় আঘাত করলে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এরপর ৭ ফেব্রুয়ারি ধামইরহাট উপজেলার জাহানপুর গ্রামে শাহিন ইসলামের স্ত্রী সুলতানা বেগমসহ চারজনের ওপর হামলা চালায় সে। একই বছরের ৭ মে বদলগাছি উপজেলার দুর্গাপুর, ঘোয়ালভিটা ও নয়নশহর এলাকার তিনটি বাড়িতে দেয়াল টপকে প্রবেশ করে শাহানাজ (২২), নাসরিন (১৩) ও বাকপ্রতিবন্ধী বৃষ্টি (২০)-কে গুরুতর জখম করে।
সর্বশেষ গত ৪ জুন পত্নীতলা উপজেলার শিমুলিয়া ও নান্দাশ গ্রামে দুটি বাড়িতে জানালা ভেঙে ঢুকে রোজি আক্তার (৩৭), আলতা বানু (৪৫) ও আসমা খাতুন (২২)-এর মাথায় লোহার শাবল দিয়ে আঘাত করে গুরুতর আহত করে।
ধামইরহাট, বদলগাছি ও পত্নীতলা উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের হামলার ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং অপরাধীকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জয়ব্রত পালের নেতৃত্বে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সাইবার ইউনিটের সদস্যরা ঘটনার গভীর তদন্ত শুরু করেন। নওগাঁর পাশাপাশি জয়পুরহাট ও দিনাজপুর জেলার একই ধরনের অপরাধের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় অপরাধীর প্রোফাইল শনাক্ত করা হয়।
অবশেষে গত ১০ জুন ভোরে গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকার বাসন থানাধীন শরিফপুর কোনাপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোর্শেদকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
গ্রেপ্তারের পর নওগাঁ জেলা গোয়েন্দা শাখা কার্যালয়ে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে ধামইরহাটের কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবা হত্যার দায় স্বীকার করে। পরে বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। বর্তমানে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, “অত্যন্ত নিবিড় ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের মাধ্যমে নওগাঁ জেলা পুলিশ এই সিরিয়াল অপরাধীর পরিচয় উদ্ঘাটন এবং তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। নওগাঁর চারটি ঘটনার পাশাপাশি দিনাজপুরে পাঁচটি ও জয়পুরহাটে একটি ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে তার হামলায় আরও দুই নারীর মৃত্যুর বিষয়েও আমরা নিশ্চিত হয়েছি। সংশ্লিষ্ট সব মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।”
তিনি আরও বলেন, “নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এ ধরনের জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে নওগাঁ জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।”
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় নওগাঁ জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যাসহ মোট চারটি মামলা দায়ের হয়েছে। পাশাপাশি দিনাজপুর ও জয়পুরহাট জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

