আবু জাফর বিশ্বাস, বরিশাল:
বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) এখন চরম অব্যবস্থাপনা, চিকিৎসকদের অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। একের পর এক শিশুমৃত্যু, রোগীর স্বজনদের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং হাসপাতালের ভেতরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে নবজাতকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে হাসপাতালে। অভিযোগ ওঠে, চিকিৎসা অবহেলার প্রতিবাদ করায় নবজাতকের দুই স্বজনকে মারধর করে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখেন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীরা। পরে গভীর রাতে মুচলেকা নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বানারীপাড়া উপজেলার উজ্জ্বল দের সাত দিনের কন্যাশিশুকে গত ১৫ মে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিশুটির মৃত্যু হলে স্বজনরা চিকিৎসকদের গাফিলতির অভিযোগ তোলেন। এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়।
এদিকে বরিশাল বিভাগে হামের প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করলেও শেবাচিমে শিশুদের চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে মাত্র ২৪টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন ভর্তি থাকছে প্রায় ২০০ শিশু। অনেক শিশুকে মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দিতে দেখা গেছে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রেও বিরাজ করছে একই চিত্র।
বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে বরিশাল বিভাগে ৩৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু শেবাচিম হাসপাতালেই মারা গেছে ২৬ শিশু। গতকাল বুধবারও মারা যায় আরও দুই শিশু।
শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেছেন হাসপাতালেরই চিকিৎসা কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ রিফাত। নিজের ২১ দিনের সন্তান হারিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়ে অভিযোগ করেন, শিশুবিশেষজ্ঞ আশীষ হালদার-কে বারবার অনুরোধ করলেও তিনি হাসপাতালে আসেননি। তাঁর এই পোস্ট ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই শেবাচিম হাসপাতালে কার্যকর তদারকির অভাব রয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে হাসপাতালের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যক্রম না থাকায় চিকিৎসাসেবায় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা ভেঙে পড়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, “মুমূর্ষু রোগী হাসপাতালে মারা যেতেই পারে।” তবে তাঁর এমন বক্তব্য নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
এ ঘটনায় নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠন দ্রুত হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা দূর করে শিশুদের নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

