শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার আগের ৪৮ ঘণ্টায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পদত্যাগের আগের রাতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী গুলি চালাবে না—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়টার্স জানায়, ওই বৈঠকের পর সেনাপ্রধান গণভবনে গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন তিনি শেখ হাসিনাকে জানান, সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী কারফিউ ও লকডাউন কার্যকরে সেনাবাহিনী আগ্রহী নয়। এর মাধ্যমে সরকারের প্রতি সেনাবাহিনীর অবস্থানের পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনার ধারাবাহিকতা জানতে রয়টার্স ১০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে বলে জানিয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। নিরাপত্তার কারণে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেও সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান পদত্যাগের আগেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভিন্ন অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। কয়েকশ সেনা কর্মকর্তার সামনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি মানুষের জীবন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান এবং পরিস্থিতি ধৈর্যের সঙ্গে সামাল দেওয়ার নির্দেশ দেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক হতাহতের পর সরকারের প্রতি সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে বলে কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মত দিয়েছেন। অনির্দিষ্টকালের কারফিউয়ের মধ্যেও ঢাকায় ব্যাপক জনসমাগম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিস্থিতির অবনতি হলে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে তিনি ও তাঁর বোন শেখ রেহানা ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর দেশটির পার্লামেন্টে জানান, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর থেকেই দিল্লি বিভিন্ন পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর শেখ হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতে যাওয়ার অনুমতি চান।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি সি-১৩০ উড়োজাহাজে শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লির কাছে হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখানে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে জানানো হয়েছিল—ভারতে তাঁর অবস্থান সাময়িক হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সে সময় ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন।
শেখ হাসিনা গত তিন দশকে প্রায় ২০ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী মত দমন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ না থাকায় আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবার সরকার গঠন করে।

