ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের ঐতিহ্যবাহী বীরজিট বিশ্ববিদ্যালয়ে (Birzeit University) আকস্মিক হানা দিয়ে তাণ্ডব চালিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। বর্বর এই অভিযানের সময় তারা ক্যাম্পাসের একজন কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মীকে বেদম প্রহার করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে চলে যায়।
আজ সোমবার (২৯ জুন ২০২৬) তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। (দ্রষ্টব্য: মূল সূত্রে সোমবারের সাথে ২৮ জুন উল্লেখ থাকলেও ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আজ ২৯ জুন)।
অনুষদে ঢুকে মধ্যযুগীয় ভাঙচুর:
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও ফিলিস্তিনি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা রামাল্লার কাছে অবস্থিত ওই স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গভীর রাতে বা ভোরে জোরপূর্বক ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রবেশ করে। তারা মূলত ক্যাম্পাসের পূর্ব দিক দিয়ে ‘শারীরিক শিক্ষা অনুষদ’ (Faculty of Physical Education) ভবনে কায়দা করে ঢুকে পড়ে। এরপর সেনারা ভেতরের আসবাবপত্র, ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম ও মূল্যবান জিনিসপত্র ভাঙচুর করে তছনছ করে দেয়।
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মীকে তারা জিম্মি করে এবং তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করে।
পরীক্ষা যথাসময়েই হবে, জানাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ:
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইসরায়েলি বাহিনীর এমন কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বীরজিট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি অফিশিয়াল বিবৃতি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছে যে—ইসরায়েলিদের এই বর্বর অভিযানের কারণে শিক্ষার্থীদের চলমান পরীক্ষার সময়সূচিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ রক্ষায় পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সমস্ত পরীক্ষা যথাসময়ে ও সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠিত হবে। কর্তৃপক্ষ তাদের ফেসবুক পাতায় ইসরায়েলি বাহিনীর ভাঙচুর করা ভবনের ধ্বংসাবশেষের বেশ কিছু ছবিও প্রমাণ হিসেবে প্রকাশ করেছে।
উল্লেখ্য, বীরজিট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর এই ধরনের হানা দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে তারা এই স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বারবার সামরিক অভিযান চালিয়েছে। সেসব অভিযানে অসংখ্য ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলা এবং ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন নথিপত্র ও সামগ্রী বুট দিয়ে মাড়িয়ে জব্দ করে নিয়ে গেছে তারা।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি আগ্রাসনের ভয়াবহ পরিসংখ্যান:
ফিলিস্তিনি সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা এবং কট্টরপন্থী অবৈধ ইহুদি দখলদারদের (Settlers) ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ১ হাজার ১৭৩ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই অল্প সময়ের মধ্যে আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৬৬৬ জন এবং নারী ও শিশুসহ প্রায় ২৩ হাজার ফিলিস্তিনিকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ফিলিস্তিনিদের আশঙ্কা, গাজা উপত্যকায় আগ্রাসনের পাশাপাশি পশ্চিম তীরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসামরিক এলাকায় এই ধরনের নিয়মিত বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে মূলত পুরো পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের নিজস্ব ভূখণ্ড করে নেওয়ার (Annexation) পথ তৈরি করছে নেতানিয়াহু প্রশাসন। এর ফলে জাতিসংঘ (UN) প্রস্তাবিত দ্বিজাতি তত্ত্ব অনুযায়ী একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ঐতিহাসিক সম্ভাবনা চিরতরে শেষ হয়ে যেতে পারে।

