চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত এই ভয়াবহ ভাঙ্গণের তান্ডবে এ ৬টি গ্রামের অধিকাংশ ফসলি জমি, বাড়িঘর, মসজিদ, মাদ্রাসা নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট যেটুকু রয়েছে তাও বিলিন হওয়ার পথে। গত ১ মাস আগেও যেখানে বাড়িঘর ছিল, এখন সেখানে অথৈ পানি। এখানকার জমিতে প্রচুর পরিমানে পটল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাষকালাই, সরিষা, ইরি-বোরো, বাঙ্গী, সব্জি, ধনিয়া সহ সব ধরণের ফসল উৎপন্ন হয়ে থাকে।
এছাড়া এখানকার কৃষকেরা ষাড় গরু, ছাগল-ভেড়া ও হাঁস-মুরগী লালন পালন করে বাড়তি আয় করে। ফলে যমুনা নদী বেষ্টিত সোনাতনী ইউনিয়নের মানুষ আগের চেয়ে অনেক স্বচ্ছল হয়ে উঠেছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এখানে নতুন করে যমুনা নদীর ভাঙ্গণ শুরু হয়েছে। ফলে এ এলাকার অধিকাংশ ফসলি জমি ও বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। ফলে এখানকার কৃষকেরা নতুন করে ভাঙ্গণের কবলে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে ধীতপুর গ্রামের শতবর্ষী রহিতন বেগম বলেন, জন্মের পর ছোটবেলা থেকেই বাবার বাড়িতে কষ্ট করেছি। আবার বিয়ের পর স্বামী গরিব হওয়ায় সেখানেও কষ্ট করেছি। এ জীবনে সুখ কি জিনিস তা পেলাম না। এখন এই বয়সে এসে যমুনা নদীর ভাঙ্গণে বাড়িঘর হারিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে কষ্ট করছি। তিনি বলেন, যমুনা নদীতে সবকিছু হারিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব । তার থাকার মত একটি ঘরও নেই। পাঁচটিনের একটি জীর্ণ ছাপড়াঘরে স্বামী হারা এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন।
জমির আইল থেকে শাকপাতা তুলে অথবা বরশি দিয়ে নদী থেকে মাছ ধরে বাজারে বিক্রির পর যে আয় হয় তা দিয়ে তাদের মা মেয়ের জীবন জীবিকা চলে। তিনি বলেন, তার বয়স এখন ১২০ এর উপরে। এ বয়সেও তার কপালে জোটেনি ভাতাকার্ড। একটি গরম কাপড়ের অভাবে রাতকাটে তার তীব্র শীতে। রক্ষুসী যমুনা তার সব সুখ কেড়ে নিয়েও শান্ত হয়নি। আবারও তার একমাত্র জীর্ণ ছাপড়ায় নজর দিয়েছে। যে কোনো মূহুর্তে তা নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেলে তিনি কোথায় যাবেন তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে ধীতপুর মসজিদের ইমাম আব্দুল আলীম বলেন, এই চরে প্রচুর পরিমানে পটল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাষকালাই,সরিষা, ইরি-বোরো, বাঙ্গী, সব্জি, ধনিয়া সহ সব ধরণের ফসল চাষ হয়ে থাকে। নানা ফসল চাষ করে এ চরের মানুষ ভালো ভাবেই জীবন যাপন করছিলো। এখন প্রায় সবারই বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ফলে তারা এখন সর্বস্ব হারিয়ে অন্যের জমিতে ঘর তুলে থাকে। আবারও তারা ভাঙ্গণের কবলে পড়ায় চরম দূর্বিপাকে পড়েছে।
তারা এখন কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবো, কি খাবে তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে।
এ বিষয়ে ওই গ্রামের শামছুল হক জানান, এ পর্যন্ত ৭ বার তার বাড়িঘর ও ফসলি জমি যমুনা নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে। আবারও তিনি ভাঙ্গণের কবলে পড়েছেন। এখন তার রাত কাটে ভাঙ্গণ আতংকে।
এ বিষয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, সোনাতনীর বালুমাটি সোনার মতই ছিল, এই বালু মাটিতে যা বুনেছি তাই ভালো জন্মেছে।
শাকসব্জি, তরুতরকারি শজপাতি বুনে আমাদের সংসার ভালোই চলছিল। এখন ভাঙ্গণের কবলে পড়ে সবকিছু নদীতে চলে যাচ্ছে। ফলে আমরা সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। এখন আমরা কোথায় যাবো, কি খাবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি। এ গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, গত ৩/৪ মাসে সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর থেকে বারোপাখিয়া পর্যন্ত ৬টি গ্রামের প্রায় ৩/৪‘শ বাড়িঘর যমুনা নদীগর্ভে চলে গেছে। এই ভাঙ্গণরোধে এখানে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
এ বিষয়ে শাহজাহান আলী বলেন, ভাংতে ভাংতে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। ভাঙ্গণরোধে কোনো সরকারই ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি বলেন, বিগত সরকার আমলে স্থানীয় এমপির কাছে আমরা ভাঙ্গণরোধে ব্যবস্থা নিতে দরখাস্ত দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা তো এখন নাই। বিদায় নিয়েছে। এ সরকার যদি ব্যবস্থা নেয় তাহলে আমরা বাঁচবো। না হলে এ ভাবেই আস্তে আস্তে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে কুরসি গ্রামের ইয়াসিন মোল্লা বলেন, আমার গোষ্ঠির প্রায় ৬০ বিঘা জমি যমুনা নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। এরমধ্যে আমার জমিই বেশি ছিল। আমি প্রায় ৬ বিঘা জমিতে সব্জি আবাদ করতাম, ধান, ভুট্টা, টমেটো, লাউ, শশা, কুমড়া, বেগুন ও শরিষার ভালো াাবাদ হোত। সর শেষ হয়ে গেছে। এখন থাকার একটু বাড়ি আছে, তাও যে কোনো মূহুর্তে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। এটুকু চলে গেলে কোথায় থাকবো তা নিয়ে চরম দুুঃশ্চিন্তায় আছি। তিনি সরকারের কাছে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে দ্রুত ভাঙ্গণরোধের জোর দাবী জানান।
এ বিষয়ে ধীতপুর ঘোনাপাড়া গ্রামের হাফেজ উদ্দিন বলেন, যমুনা নদীর ভাঙ্গণে কুরসি-ধীতপুর গরুর হাট, মসজিদ, মাদ্রাসা, বাড়িঘর ফসলি জমি সবকিছু যমুনা নদীতে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। এই ভাঙ্গণ ঠেকাতে না পাড়লে মানুষজন অসহায় হয়ে পরবে। ভাঙ্গণরোধে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এ ইউনিয়নটি সম্পূর্ণ বিলিন হয়ে যাবে। তাই সরকারের কাছে দাবী দ্রুত ভাঙ্গণরোধের ব্যবস্থা নিতে।
এ বিষয়ে জিন্নাহ মন্ডল বলেন, ভোটের সময় এলে প্রার্থীরা মুখে মিষ্টি কথা বলে, নির্বাচন চলে গেলে আর খবর থাকে না। গত সংসদ নির্বাচনেও কথা দিয়েছিল নির্বাচিত হলে কুরসি-ধীতপুর চরের ভাঙ্গণরোধে কার্যকরি ব্যবস্থা নিবেন। কিন্তু এখনও তার কোনো নমুনা দেখতে পারছি না। ভাংতে ভাংতে গ্রাম শেষ হয়ে গেলো কিন্তু ভাঙ্গণরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
তিনি চলতি বন্যায় এ ভাঙ্গণরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদেও কাছে জোর দাবী জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গত বছরে এ ২টি ইউনিয়নের ৬টি গ্রামর অন্তত ২৫০ হেক্টোর ফসলি জমি যমুনা নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে। এর বিপরিতে ৯০ হেক্টোরের বেশি জমি জেগে উঠেছে। ফলে এ ইউনিয়নে জমির পরিমাণ তেমন একটা কমেনি। তবে যে সব ফসলি জমি নতুন করে ভেঙ্গে যাচ্ছে সে সব জমির মালিক তাৎক্ষণিক ভাবে কিছুটা হলেও ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন। তাই ভাঙ্গণরোধে কার্যকরি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবরিনা সারমিন ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো: আমিনুল ইসলাম ভিডিও বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে বলেছেন, খোজ খবর নিয়ে এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডেও সাথে কথা বলবেন। এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন রোর্ডেও নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, চর রক্ষায় তাদেও কোনো প্রকল্প নেই। তাই এখানকার ভাঙ্গণরোধে তিনি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন না।

