তানভীর তুহিন, স্টাফ রিপোর্টার:
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে জনজীবন। ঝড়ের তাণ্ডবে শত শত গাছপালা উপড়ে পড়েছে, বিধ্বস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যানবাহন এবং বিস্তীর্ণ এলাকার পাকা বোরোধান মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ঝড়ের সঙ্গে টানা ভারী বৃষ্টিপাতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ ছিল যান চলাচল।
বুধবার (১৩ মে) বিকেল প্রায় ৫টার দিকে হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে প্রবল বেগে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটব্যাপী চলা এই ঝড়ে সদরপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিশেষ করে সাড়ে সাতরশি, আটরশি, বাইশরশি, সাতরশি, চাররশি, সতেররশিসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ ঝড়ের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেন।
ঝড়ের সময় প্রচণ্ড বাতাসে বহু পুরোনো ও বড় গাছ উপড়ে পড়ে। উপজেলা সদরের প্রশাসনিক ভবনের সামনেও কয়েকটি বড় গাছ ভেঙে পড়ে। বিভিন্ন সড়কে গাছ ও ডালপালা পড়ে থাকায় দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছ কেটে সড়ক পরিষ্কার করলে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

কালবৈশাখীর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে কৃষকদের ওপর। মাঠজুড়ে পেকে ওঠা বোরোধান ঝড়ের তীব্র বাতাসে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অনেক কৃষকের কয়েক মাসের কষ্ট এক ঝড়েই শেষ হয়ে গেছে।
সতেররশি গ্রামের কৃষক জাফর খান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার দুই বিঘা জমির পাকা ধান ঝড়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এখন এই ধান কেটে ঘরে তোলা খুব কষ্টের হবে। এত পরিশ্রম করে চাষ করলাম, সব শেষ হয়ে গেল।”
বাইশরশি এলাকার কৃষক সায়াদ বলেন, “এমন ঝড় অনেক দিন দেখি নাই। আমার ক্ষেতের প্রায় সব ধান পড়ে গেছে। এখন বড় ক্ষতির মুখে পড়লাম। সংসার কিভাবে চলবে বুঝতে পারছি না।”
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ঝড়ের আগে ধান কাটার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু আকস্মিক এই দুর্যোগে অনেক ক্ষেতের ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা চরম হতাশায় পড়েছেন।
ঝড়ের তাণ্ডবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়েছে। কোথাও ঘরের চালা উড়ে গেছে, কোথাও দেয়াল ধসে পড়েছে।

সতেররশি মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা তাহমিনা আক্তার বলেন, “ঝড়ের সময় হঠাৎ করে আমার থাকার ঘরটা ভেঙে পড়ে। ঘরের চাউল-ডালসহ সব জিনিসপত্র বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে। আমি গরিব মানুষ, এখন ঘর ঠিক করবো কিভাবে সেই চিন্তায় আছি।”
স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দ্রুত সরকারি সহযোগিতা না পেলে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
ঝড়ের সময় উপজেলার বিভিন্ন সড়কে বড় বড় গাছ ও ডালপালা ভেঙে পড়ে। এতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় গাছ সরিয়ে সড়ক সচল করা হয়।
সদরপুরের অটোরিকশাচালক গিয়াস বলেন, “আমি রাস্তার পাশে অটো রেখে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ গাছের বড় ডাল পড়ে আমার অটোর সামনের অংশ একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন কীভাবে সংসার চালাবো বুঝতে পারছি না।”
ঝড়ের সঙ্গে টানা ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। বাজার, হাট ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এতে সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি দেখা দেয়।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, এমন ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড় বহু বছর পর দেখা গেল। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, কৃষি ঋণ, খাদ্য সহায়তা ও ঘর পুনর্নির্মাণে সহযোগিতা না পেলে অনেক পরিবার পথে বসে যাবে। স্থানীয়দের আশা, প্রশাসন দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা কার্যক্রম শুরু করবে।

