বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের রণক্ষেত্রে সব আধুনিক সামরিক সমীকরণ পাল্টে দিচ্ছে হিজবুল্লাহর নতুন উদ্ভাবন ‘ফাইবার অপটিক ড্রোন’। শুনতে অনেকটা ঘুড়ি ওড়ানোর মতো মনে হলেও, এই ক্ষুদ্র ড্রোনটি এখন ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ড্রোনের বিশেষত্ব হলো এর পেছনে থাকা কয়েক কিলোমিটার লম্বা অতি সূক্ষ্ম ফাইবার অপটিক তার, যা ওড়ার সময় পেছনে সুতার মতো খুলে যেতে থাকে।
প্রথাগত ড্রোনগুলো রেডিও সিগন্যালের ওপর নির্ভর করলেও এটি সম্পূর্ণভাবে তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ইলেকট্রনিক জ্যামার দিয়েও এই ড্রোনকে থামানো বা এর সিগন্যাল জ্যাম করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
প্রযুক্তিগতভাবে এই ড্রোনটি অপারেটরকে অবিশ্বাস্য সুবিধা দিচ্ছে। ড্রোনের সামনে থাকা এফপিভি (FPV) ক্যামেরার লাইভ ভিডিও কোনো ‘ল্যাগ’ বা সিগন্যাল ড্রপ ছাড়াই সরাসরি অপারেটরের কাছে পৌঁছায়। যেহেতু ডেটা আদান-প্রদান তারের মাধ্যমে হয়, তাই পাহাড়ের আড়াল কিংবা বাঙ্কারের গভীর পর্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখে দেখে এটি আঘাত হানতে সক্ষম।
এছাড়া এটি কোনো রেডিও সিগন্যাল নির্গত করে না বলে আধুনিক রাডার ব্যবস্থাও একে শনাক্ত করতে পারছে না। অনেকটা ‘শব্দহীন শিকারি’র মতো কাজ করা এই ড্রোনের নিখুঁত নিশানার ভয়ে ফ্রন্টলাইনের অনেক অবস্থান থেকে ইসরায়েলি সেনারা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। কোটি কোটি ডলারের ‘আয়রন ডোম’ প্রযুক্তি যেখানে এই ক্ষুদ্র ড্রোনের সামনে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে মাত্র কয়েকশ ডলারের এই প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছে।
এই মরণঘাতী প্রযুক্তির শিকার হয়ে গত ৩০ এপ্রিল ২০২৬ সকালে দক্ষিণ লেবাননের কানতারা গ্রামে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় গোলানি ব্রিগেডের সার্জেন্ট লিয়েম বেন হামো নামে ১৯ বছর বয়সী এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। একই হামলায় আরও বেশ কয়েকজন সেনা আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই দিন উত্তর ইসরায়েলের শোমেরা এলাকায় একটি ইসরায়েলি সাঁজোয়া যানে ড্রোনটি নিখুঁতভাবে আঘাত হানলে আরও ১২ জন সেনা আহত হন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর লেবাননের এই সংঘাতে হিজবুল্লাহর ফাইবার অপটিক ড্রোন সংযোজন ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ভূখণ্ড দখল ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই ‘তারে নিয়ন্ত্রিত’ ড্রোন যুদ্ধের এক নতুন ও ভয়াবহ মাত্রা যোগ করেছে।

