নিউক্লিয়ার অস্ত্রের জগতে সাধারণত দুটি প্রধান বোমার কথা উঠে আসে—একটি হলো সাধারণ নিউক্লিয়ার বোমা বা ফিশন বোমা, আর অন্যটি হাইড্রোজেন বোমা বা থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা। “নিউক্লিয়ার বোমা” বলতে ফিশন বোমাকেই বোঝানো হয়, বা এটম বোম ও বলতে পারেন।
আর হাইড্রোজেন বোমা হচ্ছে এর একটি উন্নত সংস্করণ। এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে তাদের শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়ায়। কিন্তু দুটোকেই নিউক্লিয়ার বোমা বলা হয়।
সাধারণ নিউক্লিয়ার বোমা বা ফিশন বোমায় ভারী পরমাণু, যেমন ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়ামকে ভেঙে ছোট ছোট অংশে পরিণত করা হয়। এই বিভাজন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ব্যবহৃত বোমাগুলোর মূল ভিত্তি ছিল।
অন্যদিকে হাইড্রোজেন বোমায় হালকা পরমাণু, যেমন হাইড্রোজেনের আইসোটোপগুলোকে একত্রিত করে ভারী পরমাণুতে রূপান্তরিত করা হয়। এটা হচ্ছে ফিউশন প্রক্রিয়া, যা সূর্যের ভিতরে ঘটে থাকে, এবং এতে অনেক বেশি শক্তি উৎপন্ন হয়।
হাইড্রোজেন বোমার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্বি-স্তরীয় নকশা। এতে প্রথমে একটি ফিশন বোমাকে ট্রিগার হিসেবে ব্যবহার করে অত্যধিক উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপ সৃষ্টি করা হয়। যা পরবর্তী ফিউশন প্রতিক্রিয়া শুরু করে। ফলে এর ধ্বংসক্ষমতা সাধারণ নিউক্লিয়ার বোমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হয়। সহজ ভাষায় বললে- একটা বোমার ভিতরেই আরেকটা ছোট্ট এটম বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
প্রযুক্তিগত জটিলতার দিক থেকে হাইড্রোজেন বোমা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। ফিশন বোমা তৈরিতে যেসব দেশ সফল হয়েছে, তাদের মধ্যেও অনেকেই হাইড্রোজেন বোমার স্তরে পৌঁছাতে পারেনি। শুধু মাত্র আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ভারত হাইড্রোজেন বোমা বানাতে পেরেছে।
তবে কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, ভারতের ১৯৯৮-এর থার্মোনিউক্লিয়ার পরীক্ষার ফলাফল পুরোপুরি সফল ছিল না, বা yield (শক্তি) কম হয়েছে। ভারত এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে যে তারা সফল হয়েছে।
হাইড্রোজেন বোমার জন্য প্রয়োজন হয় অত্যাধুনিক উপাদান বিজ্ঞান, প্লাজমা নিয়ন্ত্রণ, রেডিয়েশন ব্যবস্থাপনা এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিং।
বিশ্বের মাত্র ৫টি দেশ যেমন, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ও যুক্তরাজ্য এই প্রযুক্তি সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছে। দাবি অনুযায়ী ভারতকেও ধরা যায় এই লিস্টে। তাহলে ৬টি দেশ হবে।
বর্তমানে ইরানের হাইড্রোজেন বোমা নিয়ে যে রিউমার ছড়িয়েছে, তা মূলত অস্পষ্ট এবং অপ্রমাণিত। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুসারে ইরান উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করেছে, যা ফিশন-স্তরের অস্ত্র তৈরির দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।
তবে অনেক বিশ্লেষকদের মতে ইরান ফিশন বোমা, বা এটম বোমা বানাতে সক্ষম। ইরানকে একটি “প্রান্তিক (থ্রেশহোল্ড) পারমাণবিক রাষ্ট্র” হিসেবে দেখা হয়, অর্থাৎ তাদের কাছে অস্ত্র তৈরির মতো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ও প্রযুক্তি রয়েছে, কিন্তু তারা চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়নি।
যদিও আমি মনে করি হয়ত ফিশন বোমা বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু টেস্ট করছেনা। কিন্তু হাইড্রোজেন বোমা তৈরির মতো উন্নত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ইরানের বিজ্ঞানীদের কাছে আছে কি না, এটা নিয়ে বড় কোন বিশ্লেষকও কথা বলেননি।
এমনকি ইরান নিজেও এমন কোন ইঙ্গিত দেয়নি। ইরান থেকে যেটা বলা হয়েছে— ইরানের কাছে নিউক্লিয়ার বোমা না থাকলেও ইরানের কাছে বেটার কিছু আছে। তবে এটা যে নিউক্লিয়ার বোমা এটা তারা অস্বীকার করে। সেক্ষেত্রে হাইড্রোজেন বোমাও একটা নিউক্লিয়ার বোমা’ই। তাই ইরানের কাছে হাইড্রোজেন বোমা আছে, এর কোন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। ইরান ও দাবি করেনি। তাদের কাছে কি আছে সেটা একমাত্র তারাই জানে।

