ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সূচনা ও বিবর্তনের ইতিহাস অত্যন্ত নাটকীয় এবং বৈচিত্র্যময়। আজ যে দেশটিকে ইসরায়েল নিজের অস্তিত্বের প্রধান হুমকি মনে করে, একসময় সেই ইরানই ছিল তেলআবিবের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র।
১৯৭০-এর দশকে ইরানের তৎকালীন সম্রাট রেজা শাহ পাহলভী যখন শান্তিপূর্ণ ও সামরিক উভয় প্রয়োজনে দুটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের কাজ শুরু করেন, তখন ইসরায়েল বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি। বরং বন্ধুত্বের খাতিরে ইসরায়েল ইরানকে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করত। ১৯৭৭ সালে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আইজার ওয়েইজম্যান এবং ইরানের জেনারেল হাসান তৌকানিনের মধ্যকার এক অতিগোপনীয় বৈঠকে ইসরায়েল এমন শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল, যাতে পারমাণবিক ওয়ারহেড বা বোমা সংযোজন করা সম্ভব ছিল। তৎকালীন ইরানি মন্ত্রী তৌ ফানিয়ান এই প্রস্তাবে অত্যন্ত উৎসাহিত হয়েছিলেন।
কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যের এই সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দেয়। রেজা শাহের পতন ঘটে এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে নতুন বিপ্লবী সরকার ক্ষমতায় আসে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেই খোমেনি পারমাণবিক প্রকল্পকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে সব চুল্লি ও গবেষণা কেন্দ্র বন্ধ করে দেন। এমনকি অনেক যন্ত্রপাতিও নষ্ট করে ফেলা হয়। তবে এই রক্ষণশীল অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৮০ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ইরানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ইরাক যখন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানিদের ওপর নির্বিচারে বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাস ও অপ্রচলিত মরণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করে, তখন তেহরান তার রণকৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়।
সাদ্দাম হোসেনের এই বর্বরতা আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে ক্ষুব্ধ ও বিচলিত করে তোলে। ফলে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি এবং তাঁর উত্তরসূরি আলী খামেনি সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করতে পাল্টা বিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ইরাকের রাসায়নিক ও বিধ্বংসী অস্ত্রের মোকাবিলা করতেই ইরান নতুন করে পারমাণবিক ও উন্নত অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেয়। মূলত এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের দেওয়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ধারণা আর ইরাক যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই ইরানের বর্তমান পারমাণবিক অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত হয়েছে, যা আজকের বিশ্ব রাজনীতির এক জটিল সংকটে রূপ নিয়েছে।

