বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে (BMA) ক্যাডেটদের উন্নত ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’ নামে একটি নতুন প্রশিক্ষণ ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই নতুন ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ ৪টি কোম্পানির নামকরণ করা হয়েছে ইসলামের প্রথম চার খলিফার নামানুসারে।
তবে সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাদার এই অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারতের মূলধারার গণমাধ্যম ও দেশটির প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র ও সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিএমএ-তে শুধুমাত্র ‘১ম বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’ এর অধীনে ক্যাডেটদের কমিশনপূর্ব মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। ১ম ব্যাটালিয়নের কোম্পানিগুলোর নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠদের নামে (জাহাঙ্গীর, রউফ, হামিদ, নূর মোহাম্মদ ও মোস্তফা কোম্পানি) রাখা হয়েছে, যা এখনো সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত ও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। সম্প্রতি বিএমএ-তে ক্যাডেট সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণের পরিধি ব্যাপক হারে বাড়াতে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’ এর উদ্বোধন করেন। এই নতুন ব্যাটালিয়নের ৪টি কোম্পানির নাম রাখা হয়েছে— আবু বকর কোম্পানি, উমর কোম্পানি, উসমান কোম্পানি এবং আলী কোম্পানি।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর এই নতুন নামকরণকে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়সহ মূলধারার জাতীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা অত্যন্ত নেতিবাচক এবং আক্রমণাত্মকভাবে উপস্থাপন করছেন। ভারতীয় মিডিয়ার আপত্তির মূল জায়গা হলো, তাদের দাবি—নতুন ব্যাটালিয়নে বীরশ্রেষ্ঠদের নাম না রেখে ধর্মীয় খলিফাদের নাম ব্যবহার করা বাংলাদেশের সামরিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ চেতনা থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রতীক। তারা বিষয়টিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তথাকথিত “ইসলামীকরণ” এবং উগ্রপন্থী ভাবাদর্শের অনুপ্রবেশ হিসেবে সীমান্ত রাজ্যগুলোতে প্রচারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
আসাম ও ত্রিপুরার মতো উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রাজ্যগুলোর সংবাদমাধ্যম দাবি করছে, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে এই ধরনের আদর্শিক পরিবর্তন ভারতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল, বিশেষ করে ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ (চিকেনস নেক) এবং উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক হুমকি তৈরি করতে পারে। ওপার বাংলার সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথেও এই নামকরণের একটি যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করছে।
তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতীয় মিডিয়া বিষয়টিকে যেভাবে ‘উগ্রপন্থী’ বা ‘ইসলামিস্ট’ এজেন্ডা হিসেবে রঙ চড়িয়ে একপাক্ষিক প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে, বাস্তবতার সাথে তার বিন্দুমাত্র মিল নেই। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ যেকোনো দেশের সামরিক বাহিনীতে ঐতিহাসিক মুসলিম বীর, বিখ্যাত সেনাপতি বা খলিফাদের নামে ইউনিট, নৌঘাঁটি বা কোম্পানির নামকরণ অত্যন্ত স্বাভাবিক, যৌক্তিক এবং একটি দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক সামরিক ঐতিহ্য। উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তান বা তুরস্কের মতো মুসলিম প্রধান দেশ তো বটেই, এমনকি খোদ ভারতের সামরিক বাহিনীতেও ‘রাজপুতানা রাইফেলস’, ‘শিখ রেজিমেন্ট’ বা ‘মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি’র মতো জাতিগত ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের নামে শতবর্ষী রেজিমেন্ট সগৌরবে টিকে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে, এটি কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর চাপ নয়, বরং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি নিজস্ব ও স্বাধীন অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। ১ম ব্যাটালিয়নে বীরশ্রেষ্ঠদের নাম ও সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ ও অপরিবর্তিত রেখেই কেবল নতুন ব্যাটালিয়নে ঐতিহাসিক চার খলিফার নাম যুক্ত করা হয়েছে।
ভূ-রাজনীতিবিদদের মতে, বর্তমান আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশের যেকোনো অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বা সামরিক পরিবর্তনকেও অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। তবে বাহ্যিক যেকোনো ভিত্তিহীন সমালোচনা সত্ত্বেও, মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান বজায় রেখেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিধি ও ক্যাডেটদের সক্ষমতা বৃদ্ধির এই স্বাধীন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে।

