নাজমুল হোসেন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
একাত্তরের ভয়াবহ যুদ্ধের দগদগে স্মৃতি, জীবনের দীর্ঘ পথচলার অনন্ত বেদনা আর সমাজের অবহেলার ভার বুকে নিয়েই চিরবিদায় নিলেন বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী। মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের শিকার এই নারী মঙ্গলবার (১২ মে) সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন।
বুধবার সকালে রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামের প্রবাসী রাজুর মিল চাতালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে এ শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম, রাণীশংকৈল থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
পরে স্থানীয় শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে যুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ে কিশোরী টেপরী রাণীর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বা ১৭ বছর। তখন চারপাশে ছিল আতঙ্ক, ধ্বংস আর প্রাণ বাঁচানোর আর্তনাদ। পরিবারের সদস্যদের প্রাণ রক্ষার আশায় এক অসহায় পিতা বাধ্য হয়ে মেয়েকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে তুলে দেন। সেই মুহূর্ত ছিল এক নিঃশব্দ কান্না, যা আজও এলাকার মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে আছে।
এরপর দীর্ঘ সাত মাস তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। স্বাধীনতার পর বাড়ি ফিরে আসেন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়। পরে জন্ম হয় তাঁর ছেলে সুধীর রায়ের। কিন্তু স্বাধীনতার পরও তাঁর জীবন সহজ হয়নি। সমাজের একাংশ তাঁকে ও তাঁর সন্তানকে দীর্ঘদিন কটূক্তি ও অবহেলার চোখে দেখেছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শত দুঃখ-কষ্ট আর প্রতিকূলতার মাঝেও সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন। তাঁর ছেলে সুধীর রায় বর্তমানে ভ্যানচালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন। দারিদ্র্য আর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তিনি বহন করে চলেছেন মুক্তিযুদ্ধের এক নির্মম বাস্তব ইতিহাস।
দীর্ঘ সময় অবহেলায় থাকার পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান টেপরী রাণী। এই স্বীকৃতি তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে কিছুটা হলেও মানসিক স্বস্তি এনে দিয়েছিল বলে জানান স্বজনরা। পরবর্তীতে তাঁর জীবনের গল্প দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “টেপরী রাণী শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর জীবন আমাদের স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ, কষ্ট আর সংগ্রামের গভীরতা মনে করিয়ে দেয়।”
জীবদ্দশায় টেপরী রাণীর শেষ ইচ্ছা ছিল, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো হয়। রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনারের মাধ্যমে পূরণ হয়েছে তাঁর সেই শেষ ইচ্ছা।
অভিমান, বেদনা আর আত্মত্যাগের দীর্ঘ অধ্যায় শেষে চিরবিদায় নিলেন বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী। তবে তাঁর জীবনগাথা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরকাল অনুপ্রেরণার আলো হয়ে থাকবে।

