পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই উন্নয়নে পুরনো আমলাতান্ত্রিক ও সনাতন পদ্ধতির কাজ ছেড়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আধুনিক পরিকল্পনার পথে হাঁটার কড়া তাগিদ দিয়েছেন ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এমপি। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতি ও দূরদর্শিতার সঙ্গে যারা তাল মেলাতে পারবেন না, তাদের বাদ দিয়েই সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
গতকাল সোমবার (১৮ মে) বিকালে ঢাকার বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স ভবনের সভাকক্ষে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সংক্রান্ত এপ্রিল মাসের পর্যালোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
“Either with us or without us”— কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর বার্তা
সভায় প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দীন কর্মকর্তাদের কোনো ধরণের গাফিলতি বা অজুহাত না দেখিয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কড়া মনিটরিংয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন:
“আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান যদি ১০০ মাইল বেগে থাকেন আর আমরা যদি মাইনাস ১০ মাইলে থাকি, তাহলে সামগ্রিকভাবে এখানে যারা উপস্থিত আছেন আপনাদের সবারই ক্ষতি হবে। কারণ প্রতিটা সেক্টরে কাজ খুব স্ট্রংলি মনিটরিং হচ্ছে। The man has a vision and he has a plan, and He will implement the plan. Either with us or without us. (তাঁর একটি ভিশন ও পরিকল্পনা আছে এবং তিনি তা বাস্তবায়ন করবেনই। আমাদের সাথে নিয়ে হোক কিংবা আমাদের ছাড়া হোক)। এটাই আজকের সভার মূল বার্তা।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, কাদা ছোড়াছুড়ি বা একে অপরকে দোষারোপ করে উন্নয়ন সম্ভব নয়। আগের আমলের কাজের হিসাব বর্তমান সরকারের গতিশীল কাজের সঙ্গে মেলালে চলবে না।
পার্বত্য অঞ্চলের চিরাচরিত উন্নয়ন ধারণার সমালোচনা করে ভূমি প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোটি কোটি টাকা খরচ করে শুধু গার্ডার ব্রিজ, কালভার্ট বানানো কিংবা সামাজিক সেবার নামে টনের পর টন খাদ্যশস্য বা নগদ টাকা বিতরণ করলেই মানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তন হয় না।
এখন প্রয়োজন পার্বত্য অঞ্চলের মানুষকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করা, আধুনিক প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করা এবং তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার লক্ষ্যে উৎসাহমূলক প্রকল্প নেওয়া। পুরনো রীতিনীতি ছেড়ে টেকসই বা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে হাঁটতে হবে। এই কাজে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড নয়, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকেও সমান দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার তাগিদ দেন তিনি।
পর্যালোচনা সভায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির সার্বিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি পরিসংখ্যান আকারে উপস্থাপন করা হয়:
চলতি অর্থবছরে মোট বরাদ্দ রয়েছে ৮৭২ কোটি ৪০ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) ৭৩৯ কোটি ৭৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য (পিএ) খাতে ১৩২ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
বর্তমানে এডিপিভুক্ত ৮টি প্রকল্প এবং ৩টি উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচি সচল রয়েছে।
এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৪১০ কোটি ২৪ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ছাড় করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ৪৭.০২ শতাংশ।
আলোচ্য সময় পর্যন্ত মোট ব্যয়ের অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৩৪৩ কোটি ৬৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা; যা মোট বরাদ্দের ৩৯.৪০ শতাংশ।
যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়:
সভায় পার্বত্য অঞ্চলের বর্তমান মেগা ও জনগুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। এর মধ্যে অন্যতম:
১. পার্বত্য চট্টগ্রামে তুলা চাষ বৃদ্ধি ও কৃষকদের দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প (১ম সংশোধিত)।
২. রাঙামাটি পার্বত্য জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় সংযোগ সড়কসহ আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রামে জলবায়ু সহনশীল জীবিকা উন্নয়ন ও ওয়াটারশেড ব্যবস্থাপনা শীর্ষক প্রকল্প (CRLIWM-CHT)।
৪. পার্বত্য এলাকায় টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান (২য় পর্যায়)।
৫. বান্দরবান জেলার উপজেলাগুলোতে বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাকরণ প্রকল্প।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা, মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মনিরুল ইসলাম, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থানজামা লুসাই, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদারসহ তিন পার্বত্য জেলার মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

