শাহজাহান আলী মনন, নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:
নীলফামারীর সৈয়দপুরে পেট্রোল দিয়ে আগুন লাগানো এক নাশকতার ঘটনায় ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধকে ঝলসানো অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (৩ জুন) ভোর ৪টার দিকে উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের কাচারীপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে।
নাশকতার শিকার বৃদ্ধের নাম আফাজ উদ্দিন (৬২)। তিনি কাচারীপাড়ার মৃত ঢেপা মাহমুদের ছেলে। তাঁর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ঘটনার বিষয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, পূর্বের ঝগড়ার জের ধরে প্রতিপক্ষরা প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এ নাশকতা ঘটিয়েছে। আর প্রতিপক্ষের দাবি, আক্রোশবশত মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হেনস্তা করতে নিজেরাই ঘটনা ঘটিয়েছে।
জানা যায়, সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের হামুরহাট হয়ে পার্শ্ববর্তী কিশোরগঞ্জ উপজেলার নিতাই ইউনিয়নে যাওয়ার পাকা রাস্তার পাশে জমি কিনে বাড়ি করছেন অগ্নিদগ্ধ আফাজ উদ্দিনের ছেলে অটোচালক নুর হোসেন (৩৫)। এর আশেপাশের জমিগুলো একই ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মাঝাপাড়ার আব্দুল জব্বারের (৫৮)।
পূর্ব পাশের জমিতে থাকা একটি বটগাছের ঝরে পড়া পাতা কুড়ানো নিয়ে গত জানুয়ারি মাসে বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি হয় আব্দুল জব্বারের স্ত্রী নুরজাহান বেগম (৫৫) ও নুর হোসেনের স্ত্রী লতা বেগম (২৫)-এর মধ্যে। এ সময় নুর হোসেন ঘটনাটি মোবাইলে ভিডিও করার চেষ্টা করলে আব্দুল জব্বারের ছেলে আব্দুস সালাম চঞ্চল (২৮) এসে বাধা দেন।
এতে উভয়ের মধ্যে হাতাহাতির সময় নুর হোসেনের মোবাইল স্ক্রিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে এ বিষয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মাধ্যমে স্থানীয় মেম্বার মীমাংসার চেষ্টা করলেও নুর হোসেন তা না মানায় শেষ পর্যন্ত বিরোধ রয়ে যায়। এর প্রেক্ষিতে নুর হোসেন প্রায়ই প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিলেন চঞ্চলের পরিবারকে।
দীর্ঘ ৬ মাস পর বুধবার (৩ জুন) রাত সাড়ে ৯টায় রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এক নিকটাত্মীয় রোগীকে দেখে বাড়ি ফেরার পথে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা বাজারের ধুলিয়া মোড় এলাকায় হবি পান দোকানের সামনে চঞ্চলকে একা পেয়ে অতর্কিত হামলা করে কাঠের লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর শুরু করেন নুর হোসেন।
এতে ওই এলাকার দোকানদারসহ উপস্থিত লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে নুর হোসেনকে আটক করে পাশের আব্দুল মতিনের রড-সিমেন্টের দোকানে রাখে এবং আহত চঞ্চলকে উদ্ধার করে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
পরে উত্তেজিত জনতা ঘটনার কারণ জানতে পেরে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তারাগঞ্জ থানা পুলিশ ও স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় নুর হোসেনকে তার এলাকার ওয়ার্ড মেম্বার আতিকুল ইসলামের হাতে সোপর্দ করা হয়।
মেম্বার উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে পরের দিন মীমাংসার আশ্বাস দিয়ে নিবৃত থাকতে বলেন এবং সে অনুযায়ী রাত ২টার দিকে সবাই বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু রাত ৪টার দিকে নুর হোসেনের নির্মাণাধীন পাকা বাড়ির টিনের ঘরে আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে বৃদ্ধ আফাজ উদ্দিন গুরুতরভাবে ঝলসে যান।
নুর হোসেনের স্ত্রী লতা বেগম বলেন, চঞ্চল থাই জুয়া ও ভিসা প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। সেই টাকার জোরে আমাকে কুপ্রস্তাব দেওয়া ও ইভটিজিংয়ের চেষ্টা করে। প্রায়ই বাড়ির পাশে এসে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে। অনেক সময় বটগাছে উঠে বসে থাকে। এসবের প্রতিবাদ করায় পাতা নিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে আমার গায়েও হাত তুলেছে। এমনকি তার অপকর্ম ভিডিও করতে গেলে আমার স্বামীর মোবাইল ভেঙে ফেলে।
আফাজ উদ্দিনের ছোট ছেলে আবু বকর সিদ্দিক বলেন, চঞ্চল পাতা কুড়ানো নিয়ে আমার ভাইকে মারধর করে মোবাইল ভেঙে দেয়। সেই ঘটনার বিচার না হওয়ায় সে বেপরোয়া হয়ে পড়ে। প্রায়ই ঝগড়া লাগানোর চেষ্টা করে। মঙ্গলবার রাতের তারাগঞ্জের ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই চঞ্চলসহ তার পরিবারের লোকজন আমার ভাইকে পুড়িয়ে মারতে ঘরে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন লাগিয়েছে।
কিন্তু ঘটনাক্রমে ভাই পুরোনো বাড়িতে থাকায় আমার বৃদ্ধ বাবা নৃশংসতার শিকার হয়েছেন। তিনি এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাঁকে ঢাকার বার্ন ইউনিটে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। আমরা এই অন্যায়ের বিচার চাই।
চঞ্চলের বাবা আব্দুল জব্বার বলেন, আমরা অত্যন্ত নিরীহ ও সহজ-সরল মানুষ। ৬ মাস আগের ঘটনা নিয়ে গতকাল আমার ছেলেকে মারধরের বিষয়ে আমি কোনো উচ্চবাচ্য করিনি। চেয়ারম্যান-মেম্বার যা বলেছেন তাই মেনে নিয়ে আমরা সবাই রাতে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি। সকাল ১০টার দিকে ফেসবুকে দেখে জানতে পারি আফাজ উদ্দিন আগুনে পুড়ে যাওয়ার ঘটনা।
অথচ আমাদেরকেই এর সঙ্গে জড়িত বলা হচ্ছে, যা জঘন্য মিথ্যাচার। আল্লাহর কসম করে বলছি, আমরা এ ধরনের কাজ তো দূরের কথা, কল্পনাও করিনি। যারা জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার করা হোক।
চঞ্চলের মা নুরজাহান বেগম বলেন, আমার গাছের পাতা আমি আনতে গেলে নুর হোসেনের স্ত্রী লতা আমার চুলের ঝুটি ধরে মারধর করেছে। নুর হোসেন মোবাইলে ভিডিও করলে আমার ছেলে বাধা দেয়। আমরা ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলেও মীমাংসা করেনি, উল্টো দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন আব্দুস সালাম চঞ্চল বলেন, ৬ মাস আগের ঘটনা আমি প্রায় ভুলেই গেছি। অথচ তারা আক্রোশমূলকভাবে মীমাংসা না করে মঙ্গলবার রাতে আমার ওপর হামলা করেছে। আমাকে মারধরের ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে নুর হোসেন পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়েছে। এর সঙ্গে আমরা কেউ জড়িত নই। আমি রাত থেকেই হাসপাতালে ছিলাম।
এলাকার জহুরুল হকের ছেলে মিলন হোসেন বলেন, আফাজ উদ্দিন অত্যন্ত ভালো মানুষ। কিন্তু তার ছেলেরা নষ্ট চরিত্রের। থাই জুয়া ও ভিসা প্রতারণা করে অনেক টাকা কামিয়েছে। সেই টাকায় জমি কিনে বাড়ি করেছে এবং আমাদের নানাভাবে হয়রানি করছে। নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে তারা যেকোনো কাজ করতে পারে।
একজন নিরীহ ছেলের ওপর মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে পুরো পরিবারকে পর্যুদস্ত করতে পেট্রোল দিয়ে আগুন লাগানোর ঘটনা তারা নিজেরাই ঘটিয়েছে। তারা কখনো বলছে পেট্রোল দিয়ে আগুন লাগিয়েছে, আবার কখনো বলছে অ্যাসিডে ঝলসে দেওয়া হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই সত্য বেরিয়ে আসবে। আমরা ন্যায়বিচার চাই।
রেজাউল ইসলাম নামে আরেকজন বলেন, মূলত নুর হোসেন ঘরে আগুন লাগানোর নাটক করে চঞ্চলদের কোণঠাসা করতে চেয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার বাবা এই পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। যে টিনের ঘরে আগুন লেগেছে সেখানে দুটি কাঠের চৌকি আছে। উত্তর দিকেরটাতে বিছানা ছিল এবং সম্ভবত সেখানেই তিনি ঘুমাতেন। অথচ দক্ষিণ পাশের চৌকিতে কোনো বিছানা ছিল না এবং সেদিকের টিনের বেড়ায় আগুনে পোড়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে।
তাছাড়া ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নেই। সন্দেহভাজনভাবে অহেতুক চঞ্চলদের দোষারোপ করা হচ্ছে। চঞ্চল রাতে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ওই পরিবারের অন্যরাও এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে না। এমনও হতে পারে তৃতীয় কোনো পক্ষ এই আগুন লাগিয়ে উভয় পরিবারের দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। যেই জড়িত থাকুক, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
এলাকার ৩নং ওয়ার্ডের মেম্বার আতিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি চরম ন্যাক্কারজনক। চঞ্চল বা তার পরিবারের পক্ষে এমন কাজ করা সম্ভব নয়। আবার নুর হোসেনদের পক্ষেও নিজেরা করেছে—এটা বিশ্বাস হয় না। তবে যেহেতু ঘটনা ঘটেছে, তাই সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কাউকে অহেতুক হয়রানি করাও ঠিক হবে না। বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।
এদিকে ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার আনোয়ারুল ইসলামের ছেলে সাবেক ছাত্রদল নেতা মাহমুদুল হাসান সুমন বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত এক লোমহর্ষক ঘটনায় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। আমরা সবাই হতভম্ব। দুই পরিবারই বিপর্যস্ত। আমরা চেষ্টা করছি যেন কোনো বাড়াবাড়ি না হয়।
ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জুয়েল চৌধুরী বলেন, এই ঘটনায় নুর হোসেনের পরিবার কোনোভাবেই জড়িত নয় বলে আমি বিশ্বাস করি। ঘটনাটি গ্রহণযোগ্য নয়। এই অপরাধের চরম শাস্তি হওয়া উচিত। তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।

