ক্রাইম রিপোর্টার,
দেশের প্রথম শ্রেণির পৌরসভাগুলোর অন্যতম নরসিংদী পৌরসভা। তবে নাগরিক সেবার মান, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে দিন দিন বাড়ছে জনঅসন্তোষ। পৌর এলাকার বিভিন্ন সড়কে খানাখন্দ, ভাঙাচোরা রাস্তা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নোংরা পরিবেশে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ।
এর মধ্যেই পৌরসভার বিভিন্ন দপ্তরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে পৌরসভার সচিব মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক দশক ধরে তিনি একই পৌরসভায় দায়িত্ব পালন করছেন।
দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে তিনি একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেছেন। অফিস চলাকালীন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আড্ডা, তোষামোদ এবং প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি মৃত্যু সনদ সংক্রান্ত একটি ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসে পৌর প্রশাসন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, বকুল চন্দ্র বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তি হলফনামার মাধ্যমে দাবি করেন, তার পিতা হরিদাস চন্দ্র বিশ্বাস ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান। ওই তথ্যের ভিত্তিতে নরসিংদী পৌরসভা মৃত্যু সনদ প্রদান করে।
পরবর্তীতে ৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নরসিংদী পৌরসভার নপৌস/স্বাস্থ্য-১২/২০২৬/৭৯ নম্বর স্মারকে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান মৃত ব্যক্তির মৃত্যু তারিখের সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য আদালতে প্রতিবেদন চেয়ে আবেদন পাঠান।
বিষয়টি জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মেশকাতুল ইসলামের আদালতে উপস্থাপিত হলে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, হলফনামার বিষয়বস্তুর সত্যতা যাচাই আদালতের কাজ নয়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন-২০০৪ অনুযায়ী তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের।
পরে আদালত নরসিংদী পৌরসভাকে সঠিক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন এবং ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে লিখিত ব্যাখ্যাসহ আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।
এ ঘটনায় পৌর প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা ও নিবন্ধন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয়দের মাঝে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, যথাযথ যাচাই ছাড়া জন্ম ও মৃত্যু সনদ ইস্যু করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর রাশেদুল ইসলামকে ঘিরেও উঠেছে নানা অভিযোগ। তার দায়িত্ব মূলত খাদ্য প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যবিধি তদারকি, বাজার ও কসাইখানা পরিদর্শন, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ, মশক নিধন কার্যক্রম, খাদ্য ও পানির মান পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজ বাদ দিয়ে তিনি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন।
সরে জমিনে গিয়ে দেখা গেছে, স্যানিটারি অফিস কক্ষেই চলছে জন্ম নিবন্ধনের কাজ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাশেদুল ইসলাম দাবি করেন, এটি তার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। যদিও নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৌরসভায় নির্ধারিত আলাদা বিভাগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঘোড়াশাল পৌরসভা থেকে বদলি হয়ে আসেন রাশেদুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি বদলি হয়ে এসেছেন এবং যোগদানের পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রশাসনিক আইডি ও কার্যক্রম নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন।
এমনকি পৌর নির্বাহী কর্মকর্তার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভুল তথ্য দিয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সনদ তৈরি করা হচ্ছে। এতে সরকারি তথ্যভান্ডারের নির্ভরযোগ্যতা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম প্রশাসকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত। একজন স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালনা হলে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মৌখিকভাবে অবগত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে পৌরবাসীর মধ্যে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পৌরসভার সচিব মাহফুজুর রহমান বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া তিনি এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে পারবেন না। ফলে তার বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে পৌর প্রশাসক ও জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব নাদিরা আখতার বলেন, “বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।”
পৌরবাসীর দাবি, নরসিংদী পৌরসভায় চলমান অনিয়ম, দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং নাগরিক সেবা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হোক।

