লালমনিরহাট জেলার বহুল আলোচিত দহগ্রাম সীমান্ত থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআরআইয়ের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) সাব্বির বিন শামসকে আটক করেছে পাটগ্রাম থানা পুলিশ।
সাব্বির বিন শামস রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর শের শাহ সূরী রোড এলাকার বাসিন্দা হলেও তাঁর জন্মস্থান ঠিকানা- লালমনিরহাট সদর উপজেলা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার (১৬ মে) দুপুরে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার ভারতীয় সীমান্ত ঘেরা দহগ্রাম ইউনিয়নের বঙ্গেরবাড়ী বাজার এলাকায় সন্দেহ জনকভাবে ঘোরাফেরা সময় তাঁকে আটক করা হয়েছে।
পাটগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ মো: নাজমুল হক জানান, এ সময় তার কাছে পাওয়া যায় সাতটি পাসপোর্ট। এর মধ্যে রয়েছে- দুইটি কূটনৈতিক পাসপোর্ট, আর্ন্তজাতিক ড্রাইভিং লাইসেন্স ও বাংলাদেশী মুদ্রা ছিল।
তিনি আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেন, তিনি ভারত থেকে অবৈধভাবে দেশে অনুপ্রবেশ করেছেন। তিনি আরও বলেন, অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনে লালমনিরহাট ডিবি পুলিশের নিকট সাব্বির বিন শামসকে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে তাঁর নামে মামলা রয়েছে।
লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, সাব্বির বিন শামস অবৈধভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। পাটগ্রামের দহগ্রাম এলাকায় তার চলাফেরায় স্থানীয়দের সন্দেহ হলে তারা পুলিশে খবর দেয়। পরে তাকে পুলিশ আটক করে থানা হেফাজতে নেয়। পরে সেখান থেকে তাকে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ এ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে গা বাঁচাতে ভারতে পালিয়ে যান সাব্বির বিন শামস।
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনের বৈধতা তৈরিতে প্রপাগান্ডা কেন্দ্র হিসেবে কথিত গবেষণা কার্যক্রম চালাতো সিআরআই। এই প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী লীগের কাছ থেকে অনুদানের নামে অর্থ আত্মসাৎ করত। দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান চালিয়ে সিআরআইয়ের দুর্নীতির প্রমাণ পায়।
অনুদানের টাকা আত্মসাৎ ও সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে সংস্থাটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়সহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন সিআরআইয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল), ট্রাস্টি ও শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, ট্রাস্টি নসরুল হামিদ (বিপু), ট্রাস্টি বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক শাব্বির বিন শামস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য রওশন আরা আক্তার ও সাবেক চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন ভুঁইয়া, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল।
সিআরআই ২৩টি কোম্পানির কাছ থেকে ৪৫ কোটি ৩৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা অনুদান গ্রহণ করেছে। সংস্থাটি ২০১৩–১৪ করবর্ষ থেকে ২০২৩–২৪ করবর্ষ পর্যন্ত ১০০ কোটি ৩১ লাখ ৪০ হাজার ৪৮৬ টাকা অবৈধভাবে আয় করে। ওই সময়ে সিআরআই ব্যয় করেছে ২৯ কোটি ৫০ লাখ ৯৮ হাজার ৯৬ টাকা। ব্যয়ের টাকা বাদ দিয়ে ৭০ কোটি ৮০ লাখ ৪২ হাজার ৩৯০ টাকা জমা থাকার কথা। কিন্তু আছে ৫৫ কোটি ১১ লাখ ৮২ হাজার ৮৯৬ টাকা। অনুদানের টাকা থেকে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ ৫৯ হাজার ৫২১ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
দুদক জানায়, সিআরআইয়ের ২৫টি ব্যাংক হিসাবে ২৪৭ কোটি ৮৫ লাখ ৩৬ হাজার ১৭০ টাকা জমা এবং ১৯১ কোটি ২১ লাখ ৪৩ হাজার ৩০৯ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। এভাবে ব্যাংক হিসাবগুলোতে প্রায় ৪৩৯ কোটি ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৪৮০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে।
সাব্বির বিন শামস নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিন বছরের চুক্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিজি এবং যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ‘মিনিস্টার’ পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করেন। তার নামে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাপরিচালক(ডিজি) বাংলাদেশ হাই কমিশনের সাবেক ‘মিনিস্টার পাবলিক ডিপ্লোমেসি’ মোঃ সাব্বির বিন শামস সুমন (৫৭)কে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন খাঁনের বাড়ী লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের সময় দগ্ধ হয়ে ৬ ছাত্র হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
রবিবার (১৭ই মে) বিকাল ৩টায় সদর থানা পুলিশ লালমনিরহাট সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত-১ এ সোপর্দ করলে বিজ্ঞ আদালত জামিন আবেদনের শুনানি শেষে জামিন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাাঠানোর আদেশ দেন।পরে কোর্ট পুলিশ তাঁকে লালমনিরহাট কারাগারে প্রেরণ করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন সুমন খাঁনের বিলাসবহুল বাড়ি লুটপাট, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৬ ছয়জন কিশোর-যুবক দগ্ধ হয়ে মারা যায়। ওই হত্যার ঘটনায় বাড়ির মালিক আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ সাখাওয়াত হোসেন সুমন খাঁনসহ ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করে সদর থানায় ২৭মে ২০২৫ সালে একটি মামলা দায়ের করা হয়,মামলার বাদী আরমান আরিফ (২৭)নিহত ‘ছাত্র-জনতা’ আন্দোলনে নিহতের সহযোদ্ধা দাবী করে এই মামলাটি দায়ের করেন।
লালমনিরহাট সদর থানার ওসি সাদ আহম্মেদ জানান, পাটগ্রাম থানার জিডি মুলে আটক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক ডিজি মোঃ সাব্বির বিন শামস সুমনকে লালমনিরহাট ডিবি পুলিশ শনিবার রাতেই সদর থানায় হস্তান্তর করে। লালমনিরহাট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্ত্বরের সুমন খানের বাড়ী লুটপাট, অগ্নিসংযোগের সময় দগ্ধ হয়ে ৬জনের মৃত্যুর ঘটনায় সদর থানার জিআর ৩০১ নম্বর মামলার তদন্তে প্রাপ্ত আসামি হিসেবে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রবিবার বিকালে লালমনিরহাট বিজ্ঞ আদালতে তাঁকে সোপর্দ করা হয়েছে।’
সাব্বির বিন শামস সুমন এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমার নামে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলা চলমান রয়েছে। কিন্তু এখনও সেই মামলার চার্জশীট দেয়া হয়নি। এছাড়া আর কোনো মামলা ছিল না।
তিনি আরও বলেন, ২০২০ সালের আগষ্ট মাসে আমি সিআরআই থেকে পদত্যাগ করেছি। ২০২১ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিজি হিসেবে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ পাই। প্রায় সাত মাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করার পর ওই বছরে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাই কমিশনে ‘মিনিস্টার পাবলিক ডিপ্লোমেসি’ পদে পাঠানো হয়। আমি ২০২৩ সালে মিনিস্টার পাবলিক ডিপ্লোমেসি পদ থেকে পদত্যাগ করেছি।
সাব্বির বিন শামস সুমনের আইনজীবী অ্যাডঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত-১ এর বিজ্ঞ বিচারক মোঃ আলাউদ্দীন রবিবার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে জামিন শুনানি করেন। আওয়ামী লীগ নেতা সাখাওয়াত হোসেন সুমন খানের বাড়ী লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের সময় দগ্ধ হয়ে ৬ জনের মৃত্যুর সময় আমার মোয়াক্কেল লালমনিরহাটে ছিলেন না। বর্তমানে তিনি একজন বয়স্ক ও ডায়াবেটিস সহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগী। এসব বিষয় তুলে ধরে বিজ্ঞ আদালতে জামিন প্রার্থনা করেছি। কিন্তু আমরা আদালতে ন্যায় বিচার পাইনি। আমরা উচ্চ আদালতে যাবো।

