অ্যামেরিকার প্রতিনিধি দল চীন ছাড়ার আগে, অর্থাৎ ঠিক বিমানে ওঠার মুহূর্তে চীনের দেওয়া উপহারগুলো রানওয়ের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে গেছে। এই ঘটনাটি কোনো গোপন বিষয় ছিল না, বরং প্রকাশ্যেই করা হয়েছে। উপহারের মধ্যে ছিল বিভিন্ন চাইনিজ সুভ্যেনির এবং এমনকি চকলেটও।
হোয়াইট হাউজের কর্মী এবং সফরসঙ্গী সংবাদমাধ্যমের সদস্যদের আগেভাগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল চীনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া সমস্ত সামগ্রী ফেলে দেওয়ার জন্য। অ্যামেরিকা একে ‘নিরাপত্তা প্রটোকল’ হিসেবে আখ্যা দিলেও এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভয়। তারা মনে করছে, এসব উপহারের মাঝে হয়তো এমন কোনো ট্র্যাকিং ডিভাইস আছে যা দিয়ে চীনের কর্তৃপক্ষ মার্কিন প্রেসিডেন্টের গোপন কথোপকথন ট্র্যাক করতে পারবে।
এখানেই জন্ম নেয় এক বড় প্রশ্ন। যারা দিনরাত দাবি করে যে তাদের প্রযুক্তি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ, তারা কেন কয়েক ঘণ্টা আগে পাওয়া উপহারগুলো নিজেদের প্রযুক্তি দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারল না যে তাতে কোনো ট্র্যাকিং ডিভাইস আছে কি না? এর সহজ মানে হলো, অ্যামেরিকা মনে মনে স্বীকার করে নিয়েছে যে চীনের কাছে এমন উন্নত প্রযুক্তি আছে যা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। মুখে স্বীকার না করলেও তাদের আচরণে সেই ভয় স্পষ্ট। যদিও মার্কিন সংবাদমাধ্যম একে প্রটোকল বলে সাফাই দিচ্ছে, কিন্তু চীনের পক্ষ থেকে পাল্টা প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, যদি এমনই হয় তবে উপহার গ্রহণের আগেই তা জানানো হলো না কেন? আসলে চীনকে কোনোভাবেই আটকাতে না পারার এক চরম হতাশা থেকেই এমন অশোভন আচরণ বেরিয়ে আসছে।
অ্যামেরিকার এই সাম্রাজ্যবাদী দম্ভের বিপরীতে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান এক ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলছে। ২০০১ সালে অ্যামেরিকার নমিনাল জিডিপি ছিল প্রায় ১০.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর তখন চীনের ছিল মাত্র ১.৩ ট্রিলিয়ন। অর্থাৎ ২৫ বছর আগে চীন অ্যামেরিকার ধারেকাছেও ছিল না। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান চিত্রে অ্যামেরিকার জিডিপি ৩২-৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও চীন ২১-২২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে। গত ২৫ বছরে অ্যামেরিকার অর্থনীতি বেড়েছে মাত্র ৩ গুণ, সেখানে চীনের বেড়েছে ১৬ থেকে ১৭ গুণ। এই গতিতে এগোলে আগামী ৭-৮ বছরের মধ্যে চীন নমিনাল জিডিপিতেও অ্যামেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপি (PPP)। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে চীনের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ৪৪.৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা অ্যামেরিকার ৩২.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে প্রায় ৩৭ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ ক্রয়ক্ষমতায় চীন ইতিমধ্যেই বিশ্বের এক নম্বর শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অথচ ট্রাম্প এবং মার্কিন প্রশাসনের হাবভাব দেখে মনে হয় তারা এখনো সেই পুরনো শ্রেষ্ঠত্বের বুদ হয়ে আছে।
ইতিহাস সাক্ষী, যেকোনো সাম্রাজ্য যখন পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়, তখন তারা অত্যন্ত এলোমেলো এবং আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে। নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রাম্প নাকি আবারও ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চীনের কাছে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পাত্তা না পেয়ে এখন তারা বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ বাঁধিয়ে নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা করছে। ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষণে এটি একটি ধ্রুব সত্য যে, পতনোন্মুখ শক্তিগুলোই সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন আর প্রশ্নটি এটি নয় যে অ্যামেরিকান সাম্রাজ্যের পতন হবে কি না। বরং প্রশ্ন হলো, এই পতন কখন এবং কত দ্রুত ঘটবে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সচেতন শিক্ষার্থীরাও এখন ক্লাসরুমে বসে অকপটে স্বীকার করছে যে, অ্যামেরিকার একক আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে এসেছে। ডাস্টবিনে উপহার ফেলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে অ্যামেরিকা চীনকে ছোট করতে চাইলেও, বাস্তবে তা তাদের নিজেদের অসহায়ত্ব এবং নিরাপত্তাহীনতাকেই বিশ্বমঞ্চে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে।

