আনোয়ার শাহজাহান:
“সিলেটে আমরা বৃদ্ধাশ্রম চাই না”—এই বক্তব্যের সঙ্গে আমাদের আবেগ, পারিবারিক মূল্যবোধ ও মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা জড়িত। নিঃসন্দেহে প্রত্যেক সন্তানই চান তাঁর বাবা-মা নিজের ঘরেই, সন্তানের স্নেহ ও ভালোবাসায় শেষ জীবন কাটান। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় এত সহজ নয়।
সিলেটের অসংখ্য পরিবারের সন্তান বর্তমানে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। বছরের সর্বোচ্চ তিন-চার মাস তারা দেশে থাকতে পারেন। বাকি সময় বিদেশে থাকার কারণে বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে তাদের সব সময় চিন্তায় থাকতে হয়। বাবা-মা অসুস্থ হলে কে হাসপাতালে নিয়ে যাবে? রাতে জরুরি কিছু হলে কে পাশে দাঁড়াবে? নিয়মিত ওষুধ, খাবার কিংবা দৈনন্দিন পরিচর্যার প্রয়োজন হলে কে দেখবে?
একজন সন্তান বিদেশে বসে বাবা-মায়ের জন্য চিন্তা করেন—কিন্তু শুধু চিন্তা করলেই তো সব দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। যদি দেশে একটি মানসম্মত, নিরাপদ ও মানবিক কেয়ার হোম থাকে, যেখানে প্রশিক্ষিত কর্মী, চিকিৎসা সহায়তা, নিরাপত্তা, খাবার ও দৈনন্দিন পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকবে, তাহলে অনেক প্রবাসী সন্তান নিশ্চিন্ত হতে পারেন যে তাঁদের বাবা-মা নিরাপদে আছেন।
বরং অনেক প্রবাসী সন্তান সুযোগ পেলে নিজের বাবা-মাকে এমন একটি ভালো কেয়ার হোমে রাখতে চাইবেন, যেখানে তারা নিয়মিত খোঁজ নিতে পারবেন, খরচ বহন করতে পারবেন এবং দেশে এলে বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন।
#সন্তানহীন_প্রবীণদের_কী_হবে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যাদের কোনো সন্তানই নেই, তাঁদের বৃদ্ধ বয়সে দেখাশোনা করবে কে?
আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা নিঃসন্তান। জীবনের কর্মব্যস্ত সময় পার করে যখন তারা বৃদ্ধ হন, তখন অসুস্থতা, একাকীত্ব ও দৈনন্দিন কাজের জন্য তাদের পাশে থাকার মতো আপনজন সব সময় থাকে না।
তাদের কি কোনো নিরাপদ আশ্রয়ের অধিকার নেই?
একটি আধুনিক কেয়ার হোম তাঁদের জন্য বোঝা নয়, বরং হতে পারে নিরাপত্তা, সঙ্গ, চিকিৎসা ও মর্যাদার একটি আশ্রয়।
যুক্তরাজ্যে Care Home ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবীণদের আবাসন, খাবার, ব্যক্তিগত পরিচর্যা, ওষুধ ব্যবস্থাপনা, নার্সিং ও স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হয়।
অবশ্যই কেয়ার হোম কখনো সন্তানের ভালোবাসার বিকল্প নয়। সন্তানদের দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যও কেয়ার হোম তৈরি হওয়া উচিত নয়। বরং এটি হবে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে পেশাদার পরিচর্যার একটি অতিরিক্ত ব্যবস্থা।
আমরা চাই—যে বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে থাকতে চান, তাঁরা পরিবারের কাছেই থাকুন। আর যারা একা, নিঃসঙ্গ, সন্তানহীন কিংবা বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন অনুভব করেন, তাঁদের জন্য সম্মানজনক বিকল্প থাকুক।
বৃদ্ধাশ্রমের বিরোধিতা করার আগে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত—আমরা কি প্রত্যেক প্রবীণের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করেছি?
সিলেটে পরিবার ও পারিবারিক বন্ধন অবশ্যই থাকবে। পাশাপাশি এমন একটি আধুনিক কেয়ার ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে প্রবীণরা শেষ জীবনে একাকী নয়—নিরাপদ, সম্মানিত, সেবাপ্রাপ্ত ও আনন্দময় জীবন কাটাতে পারেন।
বৃদ্ধাশ্রম নয়—অবহেলাও নয়। প্রবীণের জন্য চাই ভালোবাসা, নিরাপত্তা, পরিচর্যা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা।

