রিপন মারমা, কাপ্তাই (রাঙ্গামাটি) :
পাহাড়, নদী আর সবুজের মিতালী ঘেরা কাপ্তাইয়ের নিসর্গ পড হাউস তখন মুখরিত তবলার গুরুগম্ভীর অথচ সুমধুর বোলে। একসময় যে বাদ্যযন্ত্রের ওপর কেবল পুরুষদের একছত্র অধিকার ভাবা হতো, সেই চেনা ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তবলার চামড়ায় ঝড় তুললেন ৬ জন অদম্য নারী। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের বিশেষ উদ্যোগে, আসন্ন ঈদুল আযহা উপলক্ষে ধারণ করা হলো এক অনন্য ও নান্দনিক সংগীতানুষ্ঠান, যা কাপ্তাইয়ের বুকে এক নতুন ইতিহাস রচনা করলো।
বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. ঈমাম হোসাইনের সার্বিক দিক-নির্দেশনায় এবং প্রযোজক মো. ইয়াদ আহমেদের সুনিপুণ প্রযোজনায় এই নান্দনিক ও মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠানটির শুটিং সম্পন্ন হয়।
এই আয়োজনের মূল আকর্ষণ ছিল কাপ্তাইয়ের স্থানীয় “সুরের ধারা” সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক ও বিশিষ্ট তবলাশিল্পী অর্ণব মল্লিকের হাত ধরে গড়ে ওঠা একঝাঁক তরুণী।
তাঁরই নিবিড় প্রশিক্ষণে “সরগম সঙ্গীত একাডেমি”র ছয়জন প্রতিভাবান ছাত্রী—অর্পিতা বণিক, কৃপা দাশ, সমৃদ্ধি ধর, মৃত্তিকা দে, হিরণ বড়ুয়া এবং অদিতি মনি অর্চি—তাদের চমৎকার যুগলবন্দী পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। প্রকৃতির আবহে তবলার লহরী যেন এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল।ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের সমাজে ভাবা হতো—তবলা শুধু পুরুষদেরই বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে নারীরাও যে এই কঠিন বিদ্যায় পারদর্শী হতে পারে, তা প্রমাণ করলেন এই ছয় কন্যা।
অনুষ্ঠান শেষে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে শিল্পীরা বলেন,
”তবলা বাজানো আমাদের জন্য শুধু কোনো পারফরম্যান্স নয়, এটি আমাদের স্বপ্ন এবং আত্মবিশ্বাসের লড়াই। একসময় অনেকেই ভাবতেন মেয়েরা তবলা বাজাতে পারবে না। কিন্তু আজ বিটিভি’র মতো এত বড় একটি মাধ্যমে পারফর্ম করতে পেরে আমাদের দীর্ঘদিনের সাধনা সার্থক মনে হচ্ছে। এই সুযোগ আমাদের ভেতরের শক্তিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের দেখে পাহাড়ের আরও অনেক মেয়ে এই শিল্পে এগিয়ে আসতে সাহস পাবে।”
প্রশিক্ষক অর্ণব মল্লিক তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “একসময় সকলের ধারণা ছিল তবলা শুধু পুরুষরাই শিখবে বা বাজাবে। কিন্তু কাপ্তাইয়ের এই মেয়েরা প্রমাণ করেছে, সুযোগ আর সঠিক নির্দেশনা পেলে নারীরাও যেকোনো কঠিন শিল্পকে জয় করতে পারে। নারীদের তবলাশিক্ষায় আগ্রহী ও উৎসাহিত করতে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের এই চমৎকার উদ্যোগ সমগ্র দেশের নারীদের অনুপ্রাণিত করবে এবং সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।”
পাহাড়ি জনপদে নারীদের এই সংগীত সাধনা এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তাদের এই অনন্য স্বীকৃতি কেবল কাপ্তাই নয়, পুরো দেশের সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে এক গভীর আবেগ ও অনুপ্রেরণার জন্ম দিয়েছে। তবলার প্রতিটি বোলে যেন ধ্বনিত হচ্ছিল—নারীরা আর পিছিয়ে নেই, তারা ভাঙছে পুরোনো দেয়াল, গড়ছে নতুন ইতিহাস।

