প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেন্দ্র করে আজ শনিবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক বিশেষ সংবাদ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দ্বিপক্ষীয় এই সফরগুলোকে বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক সম্পূর্ণ নতুন এবং সর্বোচ্চ কৌশলগত ধাপে পৌঁছেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক চমকপ্রদ তথ্য শেয়ার করে জানান, বেইজিংয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং অন্য দেশের সরকারপ্রধানকে বসিয়ে রেখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন, যা ঢাকার প্রতি বেইজিংয়ের গভীর সম্মান ও কূটনৈতিক গুরুত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
ড. খলিলুর রহমান জানান, বেইজিং সফরে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মোট ৮টি সমঝোতা স্মারক (MoU) এবং ৩টি চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলো হলো:
বাগেরহাটের মোংলা বন্দর এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) নির্মাণের চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।
বহুল আলোচিত তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (Feasibility Study) বিষয়ে দুই পক্ষই একমত পোষণ করেছে।
চীনের কুনমিং শহর থেকে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলপথে যোগাযোগের জন্য বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ‘চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার’ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে এই বিষয়ে বাংলাদেশ এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ব্রিফিংয়ে যুক্ত করে বলেন, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন যে, বেইজিং বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে একটি ‘স্থায়ী বন্ধু’ হতে চায়। পাশাপাশি উদীয়মান অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস (BRICS) এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে (SCO) বাংলাদেশের নতুন সদস্যপদ প্রাপ্তির আবেদনকে চীন পূর্ণ সমর্থন জানাবে।
চীনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকেও অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল হিসেবে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (বাংলাদেশ প্রথম) নীতির কারণে কুয়ালালামপুরে বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য এসেছে। মালয়েশিয়া সরকারের প্রকাশ করা সাম্প্রতিক ভিডিওই তার বড় প্রমাণ, যা নির্দেশ করে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কতটা গভীর।
মালয়েশিয়া সফরের প্রধান দিকগুলো হলো:
সফরে দুই দেশের মধ্যে সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ এবং দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ‘নোট অব ভার্বাল’ (Diplomatic Note) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) সম্পন্ন করতে উভয় দেশ একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মালয়েশিয়াতে বর্তমানে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসনের নীতিগত বিষয়ে ঢাকা ও কুয়ালালামপুর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এক হয়ে কাজ করবে বলে একমত হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, এই দুটি এশীয় দেশে প্রধানমন্ত্রীর ব্যাক-টু-ব্যাক সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, নতুন কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ঢাকার অবস্থানকে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেছে।

