বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলভিত্তি এখনো কৃষি। শিল্প ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটলেও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কৃষিখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জ্বালানি সংকট এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশের কৃষিকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করার বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, আসন্ন বাজেট হতে হবে কৃষিবান্ধব, উৎপাদনমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কৃষকের স্বার্থরক্ষায় কার্যকর।
বর্তমানে কৃষকরা সার, বীজ, কীটনাশক, ডিজেল, বিদ্যুৎ ও শ্রমিক খরচ বৃদ্ধির কারণে চাপে রয়েছেন। অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষক নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বৃদ্ধি, সহজ কৃষিঋণ, বাজার মনিটরিং এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল কেনার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এছাড়া কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ট্রাক্টর, রিপার, হারভেস্টার, ড্রোন ও স্মার্ট সেচব্যবস্থার মতো প্রযুক্তি সহজলভ্য করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কৃষিযন্ত্র কেনায় ভর্তুকি ও স্বল্পসুদে ঋণ প্রদানের প্রস্তাবও এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। পর্যাপ্ত হিমাগার ও গুদাম না থাকায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। তাই প্রতিটি অঞ্চলে আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোরও আহ্বান জানানো হয়েছে। খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
নারী কৃষক ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ তহবিল গঠনের প্রস্তাবও এসেছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সুরক্ষায় সহজ শর্তে ফসল বীমা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি কার্যকর কৃষিবান্ধব বাজেট শুধু কৃষকের জীবনমান উন্নয়নই করবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য কৃষিখাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
তাদের ভাষ্য, “কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে, কৃষক বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে।” তাই ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষিখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই হবে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

