যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন জোহরান মামদানি। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে।
আজ (৫ নভেম্বর) বুধবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী মামদানি সহজ ব্যবধানে পরাজিত করেন সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো ও রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে।
এনবিসি নিউজের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রগতিশীল ভোটারদের উজ্জীবিত করে এবং দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে মামদানি এই ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নেন। তার বিজয়ে উল্লসিত প্রগতিশীল শিবির, তবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রিপাবলিকান নেতারা এবং কিছু মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট।
নিউইয়র্কের ১১১তম মেয়র হিসেবে শপথ নিতে যাওয়া মামদানি মাত্র এক বছর আগেও ছিলেন তুলনামূলক অখ্যাত এক স্টেট অ্যাসেম্বলিম্যান। অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি নিউইয়র্কের রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছেন এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর প্রার্থীদের পরপর দুটি নির্বাচনে পরাজিত করেছেন।
তার বিজয়ে অনেকেই বলছেন, এটি শুধু নিউইয়র্ক নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রগতিশীল রাজনীতির নতুন এক অধ্যায় সূচনা করেছে। এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সিটি প্রশাসনের বিশাল কাঠামো সামলানো, উচ্চাভিলাষী নীতিমালা বাস্তবায়ন করা এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতর ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।
মামদানি নির্বাচনী প্রচারণায় জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট, আবাসন সমস্যা এবং গণপরিবহন সংস্কারকে মুখ্য ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেন। তার ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ভাড়া নিয়ন্ত্রিত ফ্ল্যাটে ভাড়া বৃদ্ধিতে স্থগিতাদেশ, সার্বজনীন শিশুসেবা, বিনামূল্যে বাস চলাচল ব্যবস্থা এবং সিটি করপোরেশন পরিচালিত মুদি দোকান চালুর পরিকল্পনা।
কুইন্সে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এক সমাবেশে মামদানি বলেন, যখন আমি প্রচারণা শুরু করি, তখন সেখানে কোনো টেলিভিশন ক্যামেরা ছিল না। ফেব্রুয়ারিতেও আমাদের সমর্থন ছিল মাত্র এক শতাংশ। কিন্তু নিউইয়র্কের সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেছে যে পরিবর্তন সম্ভব।
এনবিসি নিউজের এক্সিট পোল অনুযায়ী, মামদানি নিউইয়র্কের প্রায় সব জাতিগত গোষ্ঠীর সমর্থন পেয়েছেন—শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো, এশীয় এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের বড় অংশই তাকে ভোট দিয়েছেন। ৪৫ বছরের নিচের ভোটারদের মধ্যে তিনি বিপুলভাবে এগিয়ে ছিলেন, যেখানে ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে ভোটারদের মধ্যে কুয়োমো কিছুটা এগিয়ে ছিলেন।
তবে পুরো প্রচারণাজুড়ে মামদানির মুসলিম পরিচয় এবং ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ইসরায়েলবিরোধী মন্তব্যের কারণে তাকে ঘিরে নেতিবাচক প্রচারণা চললেও শেষ পর্যন্ত ভোটাররা তার পক্ষেই রায় দিয়েছেন।
নির্বাচনের শেষ সপ্তাহে কুয়োমো তাকে নিউইয়র্কের বিভাজন সৃষ্টিকারী প্রার্থী আখ্যা দেন, আর মামদানি কুয়োমোকে ট্রাম্পের ছায়া বলে সমালোচনা করেন। নির্বাচনের আগের রাতেই ট্রাম্প প্রকাশ্যে কুয়োমোকে সমর্থন জানান।
জোহরান মামদানি বলেন, তারা চেয়েছিল এই নির্বাচনকে আমার ধর্মবিশ্বাসের ওপর গণভোটে পরিণত করতে। কিন্তু আমি লড়েছি নিউইয়র্কবাসীর জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের বিরুদ্ধে।
নিউইয়র্কের ইতিহাসে তিনিই প্রথম মুসলিম মেয়র—একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান, যিনি প্রমাণ করেছেন, প্রগতিশীল রাজনীতি ও জনগণের আস্থা মিলেই পরিবর্তনের পথ তৈরি করা সম্ভব।
