যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক মাস ধরে ইরানকে ঘিরে একের পর এক যুদ্ধের হুমকি ও আলোচনার বার্তা দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছেন। তবে তাঁর এমন বক্তব্যে আগের মতো বিচলিত হচ্ছেন না অনেক সাধারণ ইরানি।
ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৭ বছর বয়সী ফায়েজেহ বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য তাদের জীবনে প্রভাব ফেললেও প্রতিনিয়ত এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে থাকার পরিবর্তে তিনি এখন নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোতেই মনোযোগ দিচ্ছেন। নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তাকেই তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
শুধু ফায়েজেহ নন, যুদ্ধের ছয় মাস পার হওয়ার পর অনেক ইরানিই মানসিক চাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সারাক্ষণ যুদ্ধসংক্রান্ত খবর অনুসরণ করা কমিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বাভাবিক জীবন ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রোহামের মতে, ট্রাম্পের অস্পষ্ট অবস্থান ইরানের প্রধান সমস্যা নয়। তাঁর ভাষ্য, দেশের প্রকৃত সংকট হলো মতপ্রকাশের পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব এবং সাধারণ মানুষের মতামত শোনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি। আমাদের জীবনে নিশ্চয়তার অভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।’
অন্যদিকে, ফায়েজেহ মনে করেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বারবার পরিবর্তিত বক্তব্য মূলত বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলার একটি কৌশল। তাঁর মতে, এত দ্রুত পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করা একজন নেতাকে বিশ্বাস করা কঠিন। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আগামী দিনগুলোতে ইরানের অর্থনীতি আরও দুর্বল হবে এবং দেশটির মুদ্রার মান আরও কমে যেতে পারে। সোমবার তেহরানের খোলাবাজারে ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের বিনিময় হার ছিল প্রায় ১৯ লাখ ১০ হাজার রিয়াল, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি।
গত জুনে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর ইরানি রিয়াল কিছুটা শক্তিশালী হয়ে প্রতি ডলারে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার রিয়ালে নেমে এসেছিল। তবে এ সপ্তাহে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ডায়াগ্রাম প্রকাশ করে দাবি করেন, তিনি ‘ইরানের মুদ্রাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন’। এদিকে ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুলাই শেষ হওয়া ক্যালেন্ডার মাসে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে।
তেহরানের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পণ্য ব্যবস্থাপক আলীর মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান মনোযোগ থাকে পুঁজিবাজার ও তেলের দামের ওপর। তাই ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রকৃত ইঙ্গিত বোঝার জন্য তিনিও এসব সূচকের দিকে নজর রাখেন। তাঁর ধারণা, অন্তত নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা বা স্থল অভিযান চালানোর মতো পদক্ষেপ নেবেন না। বরং তিনি কৌশলগতভাবে অবস্থান পরিবর্তন করেই পরিস্থিতি পরিচালনা করবেন। আলীর বিশ্বাস, যদি কোনো সমঝোতা হয়, তবে ট্রাম্প সেটিকে নিজের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইবেন। তবে আগামী কয়েক মাস ইরানের ওপর যুদ্ধের শঙ্কা থেকেই যাবে বলে মনে করেন তিনি।
এরই মধ্যে ইরানের ওপর ‘বড় ধরনের হামলার’ হুমকির দুই দিন পর রোববার ট্রাম্প জানান, মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তায় তেহরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যেখানে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। তিনি সোমবার ওই আলোচনা হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে তাদের আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, বরং ওমানের সঙ্গে চলছে এবং একটি সমঝোতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যুদ্ধ ও আলোচনাকে ঘিরে ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও গুরুত্ব পেয়েছে। এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইকে প্রশ্ন করা হয়, ইরান কি ওয়াশিংটনকে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা না চালিয়ে আলোচনায় মনোযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে? জবাবে বাঘাই বলেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের অনেক মন্তব্যই পরে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে, তাই সেগুলোকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ নেই। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তার নীতিগত অবস্থান থেকে কোনোভাবেই সরে আসবে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দেশটির জনগণকে আবার যুদ্ধ শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কা মাথায় রেখে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কট্টরপন্থীরা অবশ্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধানের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গতকাল সোমবারও একটি চুক্তির প্রতি তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন, জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি ভবিষ্যতে ইরানের পররাষ্ট্র সম্পর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করবে।
মাসুদ পেজেশকিয়ানের এ বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর আবারও ট্রাম্পের নতুন একটি ঘোষণা আসে।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লেখেন, ‘আমরা না চাইলে ইরানে কোনো কিছুই পৌঁছাতে পারবে না, আর কোনো চুক্তি বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই পৌঁছাতে পারবে না। ইরান এটি স্বীকার করুক বা না করুক, বাস্তবতা হলো, আমরা এমন একটি সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করছি, যে সমস্যা তারা কয়েক দশক ধরে সৃষ্টি করেছে।’

