মো আলম, বান্দরবান প্রতিনিধি:
পার্বত্য চট্টগ্রামে দিন দিন চরম হুমকির মুখে পড়ছে জননিরাপত্তা, সাধারণ মানুষের জীবিকা ও মানবাধিকার। পার্বত্য অঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষের প্রকৃত চিত্র ও বস্তুনৈষ্ঠিক উপাত্ত প্রকাশ করতে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ (পিসিএনপি)। সংবাদ সম্মেলনে তারা জানান, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসে পার্বত্য অঞ্চলে অন্তত ২৪০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল ১০টায় বান্দরবান প্রেসক্লাবে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের নেতৃবৃন্দ এই তথ্য প্রকাশ করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী— পার্বত্য অঞ্চলে ৪৭টি অপহরণ এবং ১৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, চালক, কৃষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ গ্রামবাসী প্রতিনিয়ত অপহরণের শিকার হচ্ছেন।
প্রতিবেদনে পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস), ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও কেএনএফ-এর বিরুদ্ধে মারাত্মক সব অভিযোগ তোলা হয়:
শিশু ও তরুণদের ব্যবহার: পাহাড়ের বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ ৭০ জনেরও বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও তরুণকে জোরপূর্বক সশস্ত্র সংঘাত ও দলীয় কাজে যুক্ত করেছে।
নারীদের নিরাপত্তাহীনতা: গত কয়েক মাসে অন্তত ১৪ জন নারী অপহরণ, প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা পাহাড়ের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।
ভয়াবহ চাঁদাবাজি: সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মূল আর্থিক উৎস অবৈধ চাঁদাবাজি। গত এক বছরে প্রায় ১,৫২০টি চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৫-১০ লাখ টাকা, ওষুধ কোম্পানি থেকে ২-৫ লাখ টাকা, পরিবেশক কোম্পানি থেকে ১-১.৫ লাখ টাকা এবং স্থানীয় যানবাহন ভেদে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
উন্নয়ন কাজে বাধা ও ভূমি দখল: গত ৩১ মার্চ রাঙ্গামাটির আসামবস্তিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজের ৫ শ্রমিককে মারধর করে ৬০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এছাড়া মানিকছড়িতে ২০ একর বাগানবাড়ি জবরদখল এবং লামার মিরিঞ্জায় ‘জঙ্গল বিলাস’ রিসোর্টে হামলা ও ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে।
পিসিএনপি নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, আঞ্চলিক এসব সশস্ত্র সংগঠন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিদেশি বিভিন্ন গোষ্ঠীর সহানুভূতি পেতে এবং বড় অঙ্কের অর্থ বা কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর অপতথ্য ছড়াচ্ছে। “জুম্মল্যান্ড” নামে পৃথক প্রদেশের রাজনৈতিক বয়ান তৈরির চেষ্টা করে এরা পাহাড়ে নিজেদের চাঁদাবাজি, অস্ত্র চোরাচালান ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত আড়াল করতে সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পাহাড়ে সীমান্ত অতিক্রম করে অস্ত্র ও মাদক পাচার, মাইন স্থাপন এবং পাহাড়ি তরুণদের সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং মারাত্মক সামাজিক সংকট তৈরি করছে।
পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পিসিএনপি কতিপয় দাবি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে:
১. ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সুরক্ষা ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা।
২. নারী ও শিশুদের বিশেষ সুরক্ষা প্রদান এবং সাক্ষী-অভিযোগকারীদের নিরাপদ রাখা।
৩. অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধভিত্তিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক (চাঁদাবাজি) নির্মূলে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ।
৪. ভূমি বিরোধের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে নিরাপদ ও স্বচ্ছ রাখা।
সংবাদ সম্মেলন থেকে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়, পাহাড়ে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ি ও বাঙালি—সকলের সমঅধিকার এবং সম্প্রীতি বজায় থাকবে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ যেন হৃদয়ে “লাল-সবুজের পতাকা” ধারণ করে শান্তিতে বসবাস করতে পারে, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়।

