হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রকল্পে অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়, অতিরিক্ত বিল পরিশোধ এবং ভেরিয়েশনের নামে নানা অনিয়ম হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়—এমন চারা গাছের মূল্য সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন গাছ কেনার জন্য প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি এসব গাছের পরিচর্যায় আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। অথচ বিমানবন্দরসংলগ্ন বিভিন্ন নার্সারির ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব গাছের বাজারমূল্য কয়েকশ টাকার বেশি নয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ব্যয়ের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে প্রায় ২৩ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছে। প্রায় ৬৩০টি আইটেমে পরিবর্তন (ভেরিয়েশন) এনে যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই বিপুল অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
নিরীক্ষায় আরও দাবি করা হয়েছে, নতুন পুকুর নির্মাণের নামে ১০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হলেও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেখানে আগে থেকেই একটি জলাশয় ছিল, যা সংস্কার করা হয়েছে। এছাড়া মাটি পরিবহনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত দূরত্বের চেয়ে কম দূরত্বে মাটি ফেলা হলেও দীর্ঘ দূরত্বের বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় ৮৩ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া প্রকল্পের মূল চুক্তিতে না থাকা সফট ওপেনিং বা আংশিক উদ্বোধনের আয়োজনের জন্য ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়, ডিজেল পাম্প, ইউপিএস, জ্বালানি, পরামর্শকদের অতিরিক্ত বিল এবং নির্মাণকাজের গতি বাড়ানোর নামে আরও শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এসব অনিয়ম যদি পরবর্তী সময়ে অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়, তাহলে তা জবাবদিহিকে দুর্বল করবে এবং নতুন করে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যথায় সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের সংস্কৃতি বন্ধ হবে না।
অন্যদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ওঠা সব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারা অনিয়ম করেছেন, কত অর্থের অনিয়ম হয়েছে এবং কারা এতে জড়িত—সব বিষয়ই খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে শুরু হওয়া শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পরে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। প্রকল্পটির অর্থায়নের বড় অংশ দিয়েছে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা।
তবে উল্লেখ্য, নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো বর্তমানে অভিযোগ ও নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া শেষে নির্ধারিত হবে।

