লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল:
শিশুরাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ। একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু অর্থনীতি বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সেই দেশের নাগরিকদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের ওপর। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের মতো গুণাবলি বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, ভোগবাদী সংস্কৃতি, সামাজিক অবক্ষয় ও পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতার কারণে শিশুদের মানবিক বিকাশ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি শিশুর মধ্যেই জন্মগতভাবে মানবিক গুণাবলির বীজ থাকে। উপযুক্ত পরিবেশ ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে সেই গুণাবলি বিকশিত হয়, আর অনুকূল পরিবেশের অভাবে তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
মানবিক গুণাবলির অন্যতম ভিত্তি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা। ধর্ম মানুষকে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, সহানুভূতি, আত্মসংযম ও অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। এসব মূল্যবোধ শিশুদের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তাদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।
শিশুর চরিত্র গঠনের প্রথম প্রতিষ্ঠান পরিবার। বাবা-মায়ের আচরণ, পারিবারিক পরিবেশ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শিশুদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। একইভাবে বিদ্যালয়ও শিশুদের নৈতিক ও সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, সমাজসেবা, বৃক্ষরোপণ ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সহায়ক।
সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটি নিরাপদ, মূল্যবোধসম্পন্ন সামাজিক পরিবেশ এবং শিশুদের উপযোগী শিক্ষামূলক ও ইতিবাচক গণমাধ্যম তাদের সুস্থ মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। পাশাপাশি প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে অভিভাবকদেরও সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষানীতিতে নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া, শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং খেলাধুলা, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি শিশুদের মানবিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, “মানুষ গড়ার কারিগর আপনারা। এমনভাবে শিশুদের গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা কারও প্রতি নির্দয় না হয়। দেশ গড়তে মানবিক সৈনিক প্রয়োজন, আর সেই মানবিক সৈনিক তৈরি করবেন আপনারাই।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, বরং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা সম্ভব, যারা ভবিষ্যতে মানবতা, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও দেশপ্রেমের আদর্শে একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে নেতৃত্ব দেবে।

