ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এবং এখন ইরান-সংকটে ধারাবাহিক অভিযান—সব মিলিয়ে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক মার্কিন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিপুল সংখ্যক দূরপাল্লার টমাহক ক্রুজ মিসাইল, জয়েন্ট এয়ার-টু-সারফেস স্ট্যান্ড-অফ মিসাইল (JASSM), স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল (SM) এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়েছে। একই সময়ে ইরানের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয় করতে হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক এসব অস্ত্রের উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। একটি টমাহক বা উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে নতুন করে মজুত পূরণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান সংঘাত অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে চীনকে ঘিরে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কিংবা অন্য কোনো বড় সামরিক সংকটে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা কিছুটা সীমিত হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া পেন্টাগনের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়।
অন্যদিকে পেন্টাগন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা এখনো শক্তিশালী রয়েছে এবং প্রয়োজনে বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা তাদের আছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পকে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যবহৃত অস্ত্রের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা যায়।
তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং উন্নত গোলাবারুদ তৈরির জন্য বিশেষায়িত প্রযুক্তি, কাঁচামাল এবং দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজন, যা স্বল্প সময়ে বাড়ানো সহজ নয়।
এদিকে ইরান-সংকট আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ যুদ্ধ প্রস্তুতির ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ইরান সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা এবং সামরিক কৌশল নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের নজরও তত বাড়বে।

