টানা চার মাস পর অবশেষে প্রকাশ্য আনা হলো ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তেহরানের নিজস্ব কার্যালয় ‘বেত রাহবারি’ (হাউস অব লিডারশিপ)-এ মার্কিন-ইসরায়েলি ভয়াবহ বিমান হামলায় তিনি সপরিবারে নিহত হন।
তাঁর মৃত্যুর পরপরই ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হলেও, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও চলমান যুদ্ধের তীব্রতার কারণে এতদিন তাঁর মরদেহ গোপন ও সুরক্ষিত রাখা হয়েছিল।
মরদেহ অবরুদ্ধ রেখেই গত চার মাস ধরে পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ জারি রেখেছিল তেহরান। শেষ পর্যন্ত ইরানের অনমনীয় সামরিক অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়। সম্প্রতি পাকিস্তানের কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় দুপক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি ও পরিস্থিতিগত স্থিতাবস্থা অর্জিত হওয়ার পরই খামেনির জানাজা ও দাফন সম্পন্নের এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হলো।
আগামীকাল শনিবার (৪ জুলাই ২০২৬) থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত মোট ছয় দিনব্যাপী এই দাফন প্রক্রিয়া ও জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘ চার মাস পর সুপ্রিম লিডারের কফিনবন্দি দেহ প্রথমবার প্রকাশ্যে আনায় তেহরানে বিশ্বনেতাদের ঢল নেমেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যে তেহরানে পৌঁছে কফিনে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।
ঐতিহাসিক এই জানাজায় সাধারণ মুসলিমদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আফগানিস্তান ও ইরাকের সাথে থাকা নিজেদের আন্তর্জাতিক সীমান্ত সম্পূর্ণ খুলে দিয়েছে ইরান। ধারণা করা হচ্ছে, দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম এই বিদায় অনুষ্ঠানে প্রায় ২ কোটি মুসল্লি সমবেত হবেন।
৬ শহর ও কারবালার ‘বাইন আল-হারামাইন’-এ শেষ বিদায়:
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ বিদায় জানানোর ঐতিহাসিক এই আনুষ্ঠানিকতা ইরান ও ইরাকের মোট ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ শহরে সম্পন্ন হবে। যার রুটিন নিচে দেওয়া হলো:
শনিবার (৪ জুলাই): রাজধানী তেহরানের নির্মাণাধীন বিশাল ‘ইমাম খোমেনি মসজিদ কমপ্লেক্স’-এ সর্বসাধারণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য মরদেহ রাখা হবে।
সোমবার (৬ জুলাই): তেহরানের প্রধান প্রধান সড়ক দিয়ে খামেনির নিথর দেহ নিয়ে বিশাল শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই): মরদেহ নেওয়া হবে ইরানের পবিত্র ধর্মীয় নগরী কোমে। সেখান থেকে কফিন যাবে ইরাকের নাজাফ শহরে। নাজাফে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর পবিত্র মাজারে বিদায়ী আনুষ্ঠানিকতা শেষে সড়কপথে কফিন রওনা হবে কারবালার উদ্দেশ্যে।
বুধবার (৮ জুলাই): শিয়া মুসলমানদের অন্যতম পবিত্র স্থান ইরাকের ঐতিহাসিক কারবালার বিখ্যাত ‘বাইন আল-হারামাইন’ (ইমাম হুসাইন ও হযরত আব্বাসের মাজারের মধ্যবর্তী স্থান) প্রাঙ্গণে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে বহুল প্রতীক্ষিত ও প্রধান রাষ্ট্রীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই): কারবালা থেকে মরদেহ পুনরায় নাজাফ হয়ে আকাশপথে ফিরিয়ে আনা হবে খামেনির জন্মস্থান ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহর মাশহাদে। পরে সেখানকার বিশ্ববিখ্যাত ‘ইমাম রেজা (আ.)’ পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে, তাঁর বাবার কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে এই দীর্ঘমেয়াদী নেতাকে।
যেভাবে হ্যাকড সিসিটিভি ক্যামেরায় সুনির্দিষ্ট টার্গেটে হত্যা:
আলজাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে খামেনি হত্যার রোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ইরানি গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, খামেনিকে হত্যার জন্য বছরের পর বছর ধরে নিখুঁত ছক কষছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
হামলার দিন তেহরানের রাস্তার ট্রাফিক সিগন্যালের সাধারণ সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা হ্যাক করে খামেনির সুনির্দিষ্ট গতিবিধি ও অবস্থান লাইভ পর্যবেক্ষণ করছিল তারা। পরবর্তীতে খামেনি তাঁর কার্যালয়ে প্রবেশ করা মাত্রই নিখুঁত সুযোগ বুঝে মার্কিন বিমান বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে বাঙ্কার-বাস্টার গাইডেড বোমা হামলা চালানো হয়। এই হামলায় খামেনির দীর্ঘ ৩৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
অবশেষে সব ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে চার মাস পর আজ থেকে শুরু হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদী এই শাসকের অন্তিম যাত্রা।

