আফ্রিকান দেশ উগান্ডার সবচেয়ে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় দুটি স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল মুহুজি কেইনেরুগাবা।
আজ রবিবার (২৮ জুন ২০২৬) এক কঠোর ও নজিরবিহীন সামরিক নির্দেশনায় তিনি জানান, অন্যতম প্রধান সংবাদপত্র ‘ডেইলি মনিটর’ এবং জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘এনটিভি উগান্ডা’র সকল কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। তাঁর লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া এগুলো আর কোনোভাবেই পুনরায় চালু করা যাবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে সেনাপ্রধান কেইনেরুগাবা সাফ জানিয়ে দেন, তিনি উগান্ডায় তথাকথিত ‘স্বাধীন গণমাধ্যমের’ পশ্চিমা ধারণায় বিশ্বাস করেন না। তিনি অভিযোগ করেন যে, এই গণমাধ্যমগুলো দীর্ঘদিন ধরে উগান্ডা এবং দেশের সামরিক বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে অনবরত নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রচার করছে। সেনাপ্রধান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এখন থেকে দেশের কোনো গণমাধ্যমকেই উগান্ডা সম্পর্কে কোনো সংবাদ বা প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হলে তা অবশ্যই সেনাদপ্তর (Military Headquarters) থেকে যাচাই ও সেন্সর করে নিতে হবে। অন্যথায় কঠোর আইনি ও সামরিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা ও রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, বন্ধ ঘোষিত ‘ডেইলি মনিটর’ উগান্ডার সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী স্বাধীন দৈনিক পত্রিকা এবং ‘এনটিভি উগান্ডা’ অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল। এই দুটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানেরই মূল মালিকানায় রয়েছে পূর্ব আফ্রিকার বিখ্যাত ‘ন্যাশনাল মিডিয়া গ্রুপ’।
ডেইলি মনিটর কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, সেনাপ্রধানের নির্দেশনা জারির পরপরই আজ সকাল থেকে ন্যাশনাল মিডিয়া গ্রুপের রাজধানী কাম্পালার নামুওয়াঙ্গো প্রধান কার্যালয় এবং সেরেনা হোটেল সংলগ্ন টেলিভিশন স্টেশনে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সেনা সদস্যরা পুরো অফিস এলাকা কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী (কর্ডন) দিয়ে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। ফলে কোনো সাংবাদিক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং ভেতরের কাউকে বাইরে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। একইসঙ্গে এনটিভি, স্পার্ক টিভি এবং এই গ্রুপের অধীনে থাকা সবকটি এফএম রেডিও স্টেশনের সম্প্রচারও আজ রোববার থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, উগান্ডার বর্তমান বিতর্কিত সেনাপ্রধান মুহুজি কেইনেরুগাবা দেশটির দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা বর্তমান প্রেসিডেন্টের আপন ছেলে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাবার বয়স ও অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে মুহুজি কেইনেরুগাবাই বর্তমানে পর্দার আড়াল থেকে উগান্ডার ‘ডি ফ্যাক্টো’ (De Facto) বা প্রকৃত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী শাসক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।
উগান্ডায় আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধীদের দমনে এবং ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতেই সেনাবাহিনীর এই অংশটি সুপরিকল্পিতভাবে স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির শীর্ষ ও পুঞ্জীভূত গণমাধ্যমের ওপর সেনাবাহিনীর এমন নজিরবিহীন ও প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপকে উগান্ডার ভঙ্গুর গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা এবং মুক্ত সাংবাদিকতার ইতিহাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায় ও বড় আঘাত হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

