চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে অসহায়ভাবে ঝুলে থাকা এক তরুণকে নির্মমভাবে গুলি এবং এক শিশুসহ আরও দুজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রায়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মামলার অন্য দুই আসামির একজনকে যাবজ্জীবন এবং আরেকজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ রোববার (২৮ জুন ২০২৬) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি শফিউল আলম ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ঘোষিত এটি পঞ্চম রায়।
হাবিবুর রহমান (সাবেক ডিএমপি কমিশনার) মৃত্যুদণ্ড পলাতক (ইতিপূর্বে চানখাঁরপুল মামলাতেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত)
মো. রাশেদুল ইসলাম (সাবেক এডিসি, খিলগাঁও অঞ্চল) মৃত্যুদণ্ড পলাতক
মো. মশিউর রহমান (সাবেক ওসি, রামপুরা থানা) মৃত্যুদণ্ড পলাতক
তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া (সাবেক এসআই, রামপুরা থানা) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পলাতক
চঞ্চল চন্দ্র সরকার (সাবেক এএসআই, রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ি) ২০ বছরের কারাদণ্ড গ্রেপ্তার (আদালতে উপস্থিত ছিলেন)
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই উত্তর বাড্ডার বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় পুলিশি তাণ্ডবের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালে আসামিদের বিরুদ্ধে ৩টি পৃথক অভিযোগ এনেছিল প্রসিকিউশন, যার সবকটিই আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে:
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরে রামপুরার বনশ্রী এলাকায় মো. নাদিম হোসেন নামের এক আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করা। একই দিন বনশ্রী এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে প্রাণভয়ে ঝুলে থাকা নিরস্ত্র তরুণ আমির হোসেনকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও ঠান্ডা মাথায় লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে গুরুতর আহত করা (যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল)।
১৯ জুলাই বিকেলে বনশ্রী এলাকায় নির্বিচারে চালানো গুলিতে ৭ বছর বয়সী শিশু বাসিত খান মুসার মাথা ভেদ করে চলে যায় এবং একই গুলিতে তার দাদি মায়া ইসলাম ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আজ এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলো:
৩১ জুলাই ২০২৫: ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা কর্তৃক চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল।
৭ আগস্ট ২০২৫: প্রসিকিউশন কর্তৃক ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল।
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫: আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক অভিযোগ গঠন।
২৩ অক্টোবর ২০২৫ – ১৩ জানুয়ারি ২০২৬: রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন।
৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক (Arguments) শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (CAV) রাখা হয়।
১৫ জুন ২০২৬: ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন (২৮ জুন) ধার্য করা হয়।
আজ রায় ঘোষণার সময় একমাত্র গ্রেপ্তারকৃত আসামি সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে কড়া নিরাপত্তায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণা শেষে তাকে সাজা পরোয়ানাসহ পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পলাতক বাকি চার আসামির বিরুদ্ধে সাজা কার্যকর করতে অবিলম্বে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

